প্লাস্টিক বর্জ্যে বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন, চলছে পরিচ্ছন্নতা অভিযান
প্লাস্টিক বর্জ্যে বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন, চলছে পরিচ্ছন্নতা

প্লাস্টিকের মতো অপচনশীল বর্জ্যে যেন ধীরে ধীরে বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে আসা পানির বোতল, পলিথিন, প্যাকেট ও প্লাস্টিক সামগ্রী জমে থাকছে বনের বিভিন্ন খাল, চর ও সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায়। এসব প্লাস্টিক বর্জ্য সুন্দরবনের নদী-নালা ও খালে প্রবেশ করে বনের জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ব্যাহত হচ্ছে বনের গাছপালা জন্মানো এবং মাছ ও জলজ প্রাণীর প্রাকৃতিক প্রজনন প্রক্রিয়া। এর আকার দিনে দিনে ভয়াবহ হচ্ছে।

পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও বর্জ্য উদ্ধার

এ অবস্থায় বনের ভয়াবহতা হ্রাসকরণের অংশ হিসেবে সুন্দরবনে চলে পরিচ্ছন্নতা অভিযান। প্রতি সপ্তাহেই বন বিভাগ অভিযান চালায়। অভিযানে উদ্ধার হয় বস্তা বস্তা প্লাস্টিকসহ নানা বর্জ্য। সুন্দরবন পরিচ্ছন্ন অভিযান-২০২৬ ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন-এর উদ্যোগে গত ৪-৬ মে অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় কটকা, জামতলা, কচিখালি, ডিমের চর, আন্দারমানিক এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কাজ হয়। অভিযানে পাওয়া যায় প্লাস্টিক বোতল, কাচের বোতল (নাপা সিরাপ), জেলেদের জালের প্লাস্টিক পাত্র ও সোলার অংশ বিশেষ, পরিত্যক্ত জাল।

বন বিভাগের বিশেষ কার্যক্রম

প্লাস্টিক দূষণ থেকে সুন্দরবনকে বাঁচাতে বিশেষ কার্যক্রম শুরু করে বন বিভাগ। ইতোমধ্যে সুন্দরবনের ডিমের চর, কচিখালীসহ সমুদ্র তীরবর্তী বনাঞ্চল এলাকায় বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পূর্ব সুন্দরবনের সীমান্তঘেঁষা শরণখোলা উপজেলার খুরিয়াখালি গ্রামের জেলে আলতাফ শেখ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনের নদীতে জাল ফেললে মাছের সঙ্গে প্লাস্টিকের বোতল উঠে আসে। সুন্দরবনে আমরা যারা মাছ ধরতে যাই তারা কখনোই সুন্দরবনে এসব ফেলি না। কিন্তু ক্ষতি আমাদের-ই হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বন বিভাগ জানায়, সুন্দরবনকে প্লাস্টিকমুক্ত রাখার এ উদ্যোগে স্থানীয় জনগণ, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং পর্যটকদের সহযোগিতা অপরিহার্য। সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এই বিশাল জীববৈচিত্র্যের সুন্দরবনকে দূষণমুক্ত রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্য মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এটি বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকেও মারাত্মক ক্ষতি করছে। সমুদ্র ও সুন্দরবনের মাছের শরীরে এসব বর্জ্য প্রবেশ করলে এবং সে মাছ যদি মানুষ খায়, তাহলে বড় ধরনের দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) যুগ্ম সম্পাদক মাঝহারুল ইসলাম কচি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সুন্দরবনে পর্যটকদের কোনও বর্জ্য যায় না। প্রতিটি পর্যটন জাহাজে পর্যটন বর্জ্য সংরক্ষণ করা হয়। যা খুলনায় এনে অপসারণ করা হয়। তবুও সুন্দরবন পরিচ্ছন্ন রাখতে বন বিভাগের সাথে টোয়াস পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করছে। মৌসুমের শুরুতে ও মৌসুমের শেষে এ অভিযান চালানো হয়। বন বিভাগ প্রতি সপ্তাহেই অভিযান পরিচালনা করছে। মে মাসের অভিযানে কোনও পর্যটন বর্জ্য পাওয়া যায়নি।

বন বিভাগের বক্তব্য

সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, পূর্ব বিভাগে যোগদানের পর যখন বনের বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনে যাই, তখন দেখতে পাই সমুদ্র তীরবর্তী বনসংলগ্ন এলাকাগুলোতে প্রচুর প্লাস্টিক বর্জ্য জমে আছে। এরপর থেকেই সুন্দরবনকে প্লাস্টিক মুক্ত রাখার লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে কাজ শুরু করি। সবশেষ ৪-৬ মে অভিযানে প্লাস্টিক বোতল পাওয়া গেলেও পর্যটন বর্জ্য মেলেনি। কারণ এ সময়টিতে সুন্দরবনে পর্যটন বন্ধ।

তিনি বলেন, সুন্দরবনের পুর্ব বিভাগের ৬টি স্টেশনের আওতায় ৩৯টি ফাঁড়ি রয়েছে। সেখানে চাহিদার এক তৃতীয়াংশ জনবল রয়েছে। এই জনবল দিয়েই বন সুরক্ষার কাজ চলছে। বন বিভাগের পরিচ্ছন্নতা অভিযানে ট্যুর অপারেটররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

অভিযানের পরিসংখ্যান

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জ এলাকায় ২০২৫ সালের মে মাস থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত মোট ৪৭৪টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে ২৪১টি মামলা হয়। এর মধ্যে পিওআর মামলা ১০৩টি, ইউডিওআর মামলা ৬৮টি ও সিওআর মামলা ৭০টি। এসব মামলায় ৩৯৬ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে ৩৭৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়। বাকি ১৯ জন পলাতক রয়েছেন। অভিযানকালে ২৪৯ কেজি ৫০০ গ্রাম হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়। হরিণের মাথা উদ্ধার হয় ৩টি। অভিযানে উদ্ধার হয় মালা ফাঁদ ১১৪৫৫৩ ফুট, ছিটকা ফাঁদ ৮১৩টি, হাটা ফাঁদ ২২৯৪টি, গলা ফাঁদ ৭০ ফুট। বিষ উদ্ধার হয় ৯৬ বোতল ও ৫ প্যাকেট রোটেনন পাউডার। বিষযুক্ত মাছ উদ্ধার হয় ৭২৪ কেজি, শুঁটকি মাছ ২২ বস্তা, কাঁকড়া ১০৬৬ কেজি ও ১৮ ক্যারেট। অন্যান্য মাছ উদ্ধার হয় ২১৭ কেজি। ট্রলার ও নৌকা উদ্ধার হয় ৪৪৮টি। মাছ ধরা জাল উদ্ধার হয় ২৯৮টি, বর্শি উদ্ধার হয় ৬৯৫টি, চারু ৮৩৮১টি, সুন্দরী কঁচা উদ্ধার হয় ২৫৯টি, জ্বালানি কাঠ উদ্ধার হয় ৩০৩ ফুট, গেওয়া কাঠ উদ্ধার হয় ৪০টি।

স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বিভিন্ন দেশের বন সংরক্ষণে গৃহীত কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, এটি আমাদের জন্য খুব লজ্জার যে আমরা আমাদের সম্পদ রক্ষার চেষ্টা করি না। সুন্দরবন রক্ষায় তিনি সুন্দরবন বোর্ড গঠনের পাশাপাশি এই বনের মধ্য দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ করা, সন্দুরবনকেন্দ্রিক বাণিজ্য বন্ধে সংলগ্ন অধিবাসীদের জন্য বিকল্প পেশার ব্যবস্থা করাসহ বন সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সুন্দরবনের গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ

সুন্দরবন ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এই বন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রথম সারির প্রতিরা হিসেবে কাজ করে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং জলবায়ু-জনিত দুর্যোগ প্রতিরোধসহ জীববৈচিত্র‍্য ধারণ এবং লাখ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করে। তবে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং মানুষ-বন্যপ্রাণীর সংঘাত ক্রমশ: এই বনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘নবপল্লব’ এবং ‘এনগেজ ফর সুন্দরবন’ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে জাতীয় আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসার কথা বলছেন পরিবেশবাদীরা।