১৯৭১-এ তাজউদ্দীন আহমদের ভারতে আশ্রয়: গোপন মিশনের অজানা কাহিনী
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনে তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ভারতের সীমান্তে প্রবেশ করেন, যা মুজিবনগর সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত করে। বাসন্তী মুখার্জি, বিএসএফের তৎকালীন মহাপরিচালক কে এফ রুস্তমজির কন্যা, তাঁর স্মৃতিচারণে এই ঘটনার গোপন ও মানবিক দিকগুলো উন্মোচন করেছেন।
সীমান্তে অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ
শারমিন আহমদের বাবা জীবননগর সীমান্তে দায়িত্ব পালনকালে তাজউদ্দীন আহমদ ও আমীর-উল ইসলামকে দেখতে পান। তখন তারা পরস্পরকে চিনতেন না। তাজউদ্দীন আহমদ জানান, তারা স্বাধীন রাষ্ট্রের সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে ভারতের আশ্রয় চান। গোলক মজুমদার, স্থানীয় বিএসএফ কর্মকর্তা, গার্ড অব অনার দিয়ে তাদের ভারতে আমন্ত্রণ জানান। গোলক মজুমদার পরে বলেছেন, "আমি দেখলাম কী রকম ভুখা, খোঁচাখোঁচা দাড়ি, কৃষকের বেশ! এঁরাই বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ প্রতিনিধি?"
কলকাতায় গোপন আগমন
বাসন্তী মুখার্জি বলেন, তাঁর বাবা রুস্তমজি দমদম বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাজউদ্দীন ও আমীর-উল ইসলামকে সেখানে নিয়ে যান। এটি ছিল একটি টপ সিক্রেট মিশন, যা সাধারণ মানুষ জানত না। কলকাতায় তখন শরণার্থীদের ভিড়ে ফুটপাতগুলো পরিপূর্ণ ছিল। মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী বাসন্তী মুখার্জি সেসময় দেখেন, মানুষ ফুটপাতে রান্না করছে, বাথরুম করছে, যা স্যানিটেশন সংকট তৈরি করেছিল।
লর্ড সিনহা রোডে অস্থায়ী আবাস
রুস্তমজি কলকাতায় এসে লর্ড সিনহা রোডে কয়েকটি বাড়ি কিনে নেন, যেখানে বাসন্তী ও তাঁর বাবার জন্য একটি খাট ও টেবিল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। বাসন্তী জানান, "বাবা বললেন, এগুলো সরকারের বাড়ি, আমাদের টাকায় নয়।" তাজউদ্দীন আহমদ ও আমীর-উল ইসলামকে দোতলায় আলাদা ঘরে রাখা হয়েছিল। তাদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মানবিক সাহায্য ও ঝুঁকি
একদিন বাসন্তী তাঁর বাবাকে শসার স্যান্ডউইচ ও কাজুবাদাম দেন, যা পরে তাজউদ্দীন আহমদ খান, যিনি ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন ও সাত দিন ধরে খেতে পারেননি। রুস্তমজি নিজের সিল্কের পাজামা-পাঞ্জাবি তাদের পরিধানের জন্য দেন এবং রুস্তমজির নির্দেশে বাসন্তীর বাবা অমলেট বানিয়ে তাদের খাওয়ান। তাজউদ্দীন আহমদ পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, কিন্তু তিনি বলেছিলেন, "বাংলাদেশের লাখো মানুষের যে নিয়তি, আমার পরিবারকেও তো সেই একই নিয়তি বরণ করতে হবে।"
দিল্লিতে বিশেষ প্লেনে যাত্রা
১ এপ্রিল একটি বিশেষ প্লেনে তাজউদ্দীন আহমদ ও আমীর-উল ইসলামকে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা এতটাই ক্লান্ত ছিলেন যে প্লেনের মেঝেতে বিছানা পেতে তাদের ঘুমাতে দেওয়া হয়। দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়, যদিও রুস্তমজি এই বৈঠকের বিস্তারিত জানতেন না, কারণ গোপনীয়তা রক্ষার জন্য তথ্য আলাদা রাখা হয়েছিল।
আত্মসম্মান ও দেশপ্রেম
তাজউদ্দীন আহমদের আত্মসম্মানবোধ ছিল প্রবল। তিনি মাঝেমধ্যে সীমান্তে যেতে চাইতেন এবং যদি কোনো ব্যবস্থা তাঁর পছন্দ না হতো, তিনি বলতেন, "আমি থাকব না, শরণার্থীশিবিরে নিয়ে যান আমাকে।" স্বাধীনতার পর রুস্তমজি যখন বললেন, "বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, এখন থেকে আমাদের মৈত্রী চিরন্তন হবে," তখন তাজউদ্দীন আহমদ রূঢ় কণ্ঠে উত্তর দেন, "হ্যাঁ, তবে সমতার ভিত্তিতে।"
অন্যান্য নেতাদের ভূমিকা
বাসন্তী মুখার্জি উল্লেখ করেন, ভারতে আসা অন্যান্য নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ আমেরিকানদের সঙ্গে দেখা করতেন, কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ ও আমীর-উল ইসলাম কখনো এমন ষড়যন্ত্রে জড়িত হননি। তাদের নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম এই সংকটকালে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
এই সাক্ষাৎকার ১৯৭১ সালের গোপন ইতিহাসের একটি মানবিক ও ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে, যা মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা তুলে ধরে।



