গ্যাস সংকটে ২০২৮ সালের মধ্যে শত শত কারখানা বন্ধের আশঙ্কা
গ্যাস সংকটে ২০২৮ সালের মধ্যে শত শত কারখানা বন্ধের আশঙ্কা

দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় আগামী কয়েক বছরে ভয়াবহ গ্যাস সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ। পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে বড় কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় ২০২৮ সালের মধ্যে শত শত শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া বা উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা অসংখ্য শ্রমিকের কর্মসংস্থানের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের অর্থনীতিতে এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যুৎ খাতে বাড়তি সরবরাহে শিল্পাঞ্চলে সংকট

সম্প্রতি বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সরবরাহ দৈনিক ৭ কোটি ঘনফুট বাড়ানো হয়েছিল। এতে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, আশুলিয়া, চন্দ্রা, ধনুয়া, রাজেন্দ্রপুর ও কোনাবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েকশ শিল্পকারখানায় চরম গ্যাস সংকট দেখা দেয়। একই কারণে রাজধানীর কিছু বাসাবাড়িতেও জ্বলে না গ্যাসের চুলা।

চাহিদা ও সরবরাহের বিশাল ব্যবধান

দেশে এখন গ্যাসের চাহিদা দৈনিক প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। শনিবার সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৬৫ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজি ১০৩ কোটি ২৩ লাখ ঘনফুট। সরকারি হিসাবে, শুধু তিতাস এলাকায় শিল্পকারখানা ও ক্যাপটিভ সংযোগ আছে ৪ হাজার ৫০০টির বেশি। এর মধ্যে এখনই কয়েকশ কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিতাস গ্যাসের সতর্কবার্তা

তিতাস গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ রোববার যুগান্তরকে বলেছেন, 'গ্যাসের চাপ দিন দিন কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের সব শিল্পকারখানা এবং অন্যান্য গ্রাহক চরম ভোগান্তিতে পড়বেন।' তিনি জানান, বিষয়টি বিভিন্ন ফোরামে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এলএনজি টার্মিনাল নিয়ে অনিশ্চয়তা

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা যুগান্তরকে জানান, ২০২৯ সালের মধ্যে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বসাতে সরকার চেষ্টা করছে, যাতে ওই সময়ে আরও ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যায়। তবে কোন কোম্পানিকে ওই টার্মিনাল বসানোর কাজ দেওয়া হবে তার কোনো সিদ্ধান্ত গত ৫ মাসেও নিতে পারেনি সরকার।

নতুন শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগের অপেক্ষা

সরকার এখনই নতুন শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ দিতে চাপে আছে। সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগ এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়ে বছরের পর বছর গ্যাস সংযোগের জন্য অপেক্ষা করছে ৫৫০টি শিল্পকারখানা। এছাড়া আরও এক হাজার ৩০০টির মতো নতুন শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগের আবেদন বছরের পর বছর পড়ে আছে। এই ১৮০০ শিল্পগ্রাহককে সংযোগ দিতে হলে অতিরিক্ত গ্যাসের দরকার হবে ৪০ কোটি ঘনফুটের বেশি।

উৎপাদন কমছে, চাহিদা বাড়ছে

পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, সারা দেশে ধীরে ধীরে গ্যাসের সরবরাহ দারুণভাবে কমে যাচ্ছে। প্রতিবছর দেড় কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস উৎপাদন কমছে বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে, কিন্তু চাহিদা বাড়ছে তার কয়েকগুণ হারে।

সরকারি হিসাবে আগামী দিনের চিত্র

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখন দেশে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে (আমদানি করা গ্যাসসহ) ২৬৫ কোটি ঘনফুট। আগামী বছরের জুনে এই সরবরাহ ২৬০ কোটি ৭০ লাখে নামবে। ২০২৮ সালে এই সরবরাহ আরও কমে ২৫৭ কোটি ঘনফুটে পৌঁছবে। অথচ তখন চাহিদা থাকবে ৫০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, ওই বছরের শেষে দেশের ২২ ক্ষেত্রের উৎপাদন নেমে আসবে দৈনিক ৮৫ কোটি ঘনফুটে, যা এখন আছে ১৬৫ কোটি ঘনফুট।

পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অনিশ্চিত

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৯ সালে ভোলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে দৈনিক ২১ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কতটুকু হবে তার কোনো ঠিক নেই। ভোলা ক্ষেত্রের গ্যাস বরিশাল হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আনার জন্য গ্যাস লাইন বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তবে সেই পাইপলাইন কবে বসবে তা এখনো ঠিক হয়নি।

কূপ খননে সাফল্য কম

ভোলা ছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্রে কূপ খনন করে গ্যাসের উৎপাদন ২০২৯ সালের মধ্যে বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। কিন্তু গত ৪ বছরে ২০টির বেশি কূপ খনন করে ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসও সরবরাহ বাড়াতে পারেনি সংস্থাটি।

গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাস

পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে এখন ২২টি গ্যাসক্ষেত্র আছে। সবচেয়ে বেশি গ্যাস উৎপাদন হয় মার্কিন কোম্পানি শেভরনের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে, যেখানে কয়েক বছর আগে দৈনিক উৎপাদন ছিল ১২০ কোটি ঘনফুট, এখন তা নেমে এসেছে ৭৪ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুটে। তিতাস ক্ষেত্রে উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৫৪ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট, এখন কমে ৩২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট হয়েছে। হবিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রে ২২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট থেকে উৎপাদন নেমে ১০ কোটি ২০ লাখ ঘনফুটে, বাখরাবাদে ৪ কোটি ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ৯৪ লাখ ঘনফুট, ফেঞ্চুগঞ্জে ২ কোটি ৬০ লাখ থেকে ২৬ কোটি ঘনফুট (সম্ভবত ভুল, তবে উৎস অনুযায়ী), মৌলভীবাজারে ৪ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫৯ লাখ ঘনফুট, বাংগুরায় ১০ কোটি ৩০ লাখ থেকে ৩ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট এবং সিলেট গ্যাসক্ষেত্রে ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে ৬৭ লাখ ঘনফুটে নেমে এসেছে। এভাবে আস্তে আস্তে সব ক্ষেত্রে গ্যাসের প্রদীপ নিভে আসছে।

নতুন অনুসন্ধানে সময় লাগবে

গ্যাস সরবরাহ বা উৎপাদন বাড়ানোর মতো বড় কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের। মে মাসে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যা জমা হবে নভেম্বরে। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো বঙ্গোপসাগরে কূপ খননে আগ্রহী হলে তাদের সঙ্গে সমঝোতা এবং অন্যান্য সব প্রক্রিয়া শেষ করতে বেশ সময় লাগবে।