প্রতিদিন সকালে হাঁটতে যাওয়ার অভ্যাস হঠাৎ অলসতার কারণে বাদ দিলে কল্পনা করুন, পৃথিবীর বাইরে এমন এক জগৎ আছে যেখানে আপনি সেদিনও হাঁটতে গিয়েছেন। অর্থাৎ একটি সমান্তরাল পৃথিবী তৈরি হয়েছে, যেখানে আপনার প্রতিরূপটি সেই কাজটি করেছে। বই, সিনেমা বা সায়েন্স ফিকশনে এই ধারণা জনপ্রিয়, তবে পদার্থবিজ্ঞানে এটি শুধু কল্পকাহিনি নয়; কোয়ান্টাম মেকানিকস ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সমান্তরাল মহাবিশ্বের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
আমাদের মহাবিশ্ব যদি কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত হয়, তবে বিগ ব্যাং প্রক্রিয়াটি একাধিকবার ঘটতে পারে। এই ধারণা প্রাথমিকভাবে এডওয়ার্ড ট্রিয়ন এবং পরবর্তীকালে আঁদ্রে লিন্ডে ও আলেকজান্ডার ভিলেঙ্কিনের গবেষণায় উঠে এসেছে। তাদের মতে, আমাদের মতো আরেকটি পৃথিবী (প্যারালাল আর্থ) গড়ে ওঠা অসম্ভব নয়, অর্থাৎ সমান্তরাল বিশ্বে আমাদের একজন ডপেলগ্যাঙ্গার থাকতে পারে।
হিউ এভারেটের 'মেনি ওয়ার্ল্ডস ইন্টারপ্রিটেশন'
পদার্থবিদ হিউ এভারেট ১৯৫৭ সালে 'মেনি ওয়ার্ল্ডস ইন্টারপ্রিটেশন' তত্ত্ব প্রস্তাব করেন। এতে বলা হয়, প্রতিটি সিদ্ধান্ত বা সাব-অ্যাটমিক কণার প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে মহাবিশ্ব বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। যখন আমরা কোনো সংকটে পড়ে একটি সিদ্ধান্ত বেছে নিই, তখনই আরেকটি সমান্তরাল মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়, যেখানে আমাদের প্রতিরূপটি অন্য সিদ্ধান্তটি বেছে নেয়।
সংস্কৃতিতে সমান্তরাল পৃথিবীর প্রভাব
আধুনিক কালে এই ধারণা শুধু পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় সীমাবদ্ধ নয়; চলচ্চিত্র, সায়েন্স ফিকশন ও পপ কালচারেও নতুন চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। জনপ্রিয় সিনেমা যেমন 'কোহেরেন্স' (২০১৩), 'এভরিথিং এভরিহোয়্যার অল অ্যাট ওয়ান্স' (২০২২), 'দ্য ম্যাট্রিক্স' (১৯৯৯); টিভি সিরিজ যেমন 'ডার্ক', 'ফ্রিঞ্জ', 'স্ট্রেঞ্জার থিংস'; এবং সাহিত্যের বই যেমন 'জার্নি টু দ্য প্যারালাল ওয়ার্ল্ড' (আশরাফ পিন্টু), 'দ্য ম্যান ইন দ্য হাই ক্যাসল' (ফিলিপ কে ডিক), 'মেন লাইক গড' (এইচ জি ওয়েলস), 'সমান্তরাল' (তন্দ্রা বন্দ্যোপাধ্যায়) ইত্যাদি এই ধারণা ব্যবহার করে তৈরি।
এগুলো আমাদের চিরচেনা বাস্তবতা থেকে বাইরের জগতের এক সম্ভাবনাময় দুনিয়ায় নিয়ে যায়, যা কখনো রোমাঞ্চকর, কখনো ভীতিকর। বিজ্ঞান এখনো সমান্তরাল পৃথিবীর চূড়ান্ত প্রমাণ না পেলেও ধারণাটি মানুষের চিন্তার পরিধি প্রসারিত করেছে, যা দারুণ ইতিবাচক নির্দেশনা প্রদান করে।
লেখক: শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়



