বিদ্যুৎ খাতে বড় সংকট: বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকট ও ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া
বিদ্যুৎ খাতে সংকট: বেসরকারি কেন্দ্রে জ্বালানি সংকট ও বকেয়া

বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা: বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকট ও ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া

একদিকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে চলমান অস্থিরতা, অন্যদিকে সামনে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক হারে বাড়ার আশঙ্কা—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন করে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মালিকদের কাছে সরকারের বকেয়া জমেছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, সময়মতো এই বিপুল অঙ্কের অর্থ পরিশোধ না হলে জ্বালানি তেল আমদানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে এবং গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিআইপিপিএর প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক: দ্রুত বকেয়া পরিশোধের দাবি

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে বৈঠক করেছে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ)-এর একটি প্রতিনিধি দল। বৈঠকে সংগঠনের নেতারা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর তীব্র আর্থিক সংকট তুলে ধরে দ্রুত বকেয়া পরিশোধের জোরালো দাবি জানান। তবে কোনও সমঝোতা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই আলোচনা শেষ হয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।

বিআইপিপিএ নেতারা জানান, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণ বিল বকেয়া থাকায় অনেক কোম্পানি নতুন করে জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারছে না। ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

ঈদের আগেই অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা পরিশোধের দাবি

বৈঠকে বিআইপিপিএর পক্ষ থেকে ঈদের ছুটির আগেই অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা পরিশোধের জরুরি দাবি জানানো হয়। সংগঠনটির নেতারা বলেন, তেল আমদানি করতে কমপক্ষে ৪০ দিন সময় লাগে। তাই দ্রুত ঋণপত্র খোলা না হলে আগামী মাসে অনেক কেন্দ্রেই জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে।

বিআইপিপিএর সাবেক সভাপতি ইমরান করিম জানান, বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে থাকা মজুত জ্বালানি দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদন চালানো সম্ভব। তবে মজুতের অসম বণ্টনের কারণে কিছু এলাকায় এর আগেই সংকট দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪৫ থেকে ৪৯ শতাংশই বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে। ফলে সময়মতো বিল পরিশোধ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

বিপিডিবির সঙ্গে বিরোধ ও জরিমানা নিয়ে জটিলতা

এদিকে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সঙ্গে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিরোধও জটিল আকার নিয়েছে। কয়েক মাস ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে জরিমানা আরোপ নিয়ে বিরোধ চলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে না পারায় কয়েক হাজার কোটি টাকা জরিমানা ধার্য করেছে বিপিডিবি। উদ্যোক্তাদের দাবি, বিল পরিশোধ না হওয়ায় তারা জ্বালানি আমদানি করতে পারেননি। ফলে কেন্দ্র বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন, যা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী জরিমানাযোগ্য নয়।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ইমরান করিম বলেন, একই ধরনের পরিস্থিতিতে একটি বিদেশি কোম্পানির জরিমানা পরে প্রত্যাহার করা হলেও দেশীয় উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ করা হচ্ছে। বিদেশি কোম্পানির বিল সাধারণত তিন থেকে চার মাসের বেশি বকেয়া রাখা হয় না, অথচ দেশীয় উদ্যোক্তাদের আট থেকে দশ মাসের বিল আটকে আছে।

আর্থিক সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্র: ব্যাংক অর্থায়নে অনাগ্রহ

বিআইপিপিএর সভাপতি কে এম রেজাউল হাসানাত বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র আর্থিকভাবে চরম সংকটে রয়েছে। ব্যাংকগুলো নতুন করে অর্থায়নে আগ্রহী নয়। ফলে তেল আমদানি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় দ্রুত অর্থ পরিশোধ না হলে তেলের অভাবে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে, বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সমস্যার বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে শুনে তা সমাধানে কিছু সময় চেয়েছেন বলে সূত্রে জানা গেছে। তিনি দেশীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, যেকোনও সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে এবং বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ানো উচিত নয়।

বন্ডের মাধ্যমে বকেয়া পরিশোধের প্রস্তাব

এর আগে ৯ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে বিআইপিপিএ নেতারা বিকল্প হিসেবে সরকার চাইলে বন্ডের মাধ্যমে বকেয়া পরিশোধের প্রস্তাবও দেন। তাদের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দ্রুত জ্বালানি আমদানি করে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারবে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার আগে এই সংকটের সমাধান না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এতে শিল্প, ব্যবসা ও সাধারণ গ্রাহকদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।