বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের মধ্যেই ভারত থেকে পাইপলাইনে ডিজেল আসছে বাংলাদেশে
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তৈরি হওয়া তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যেই বাংলাদেশে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, ভারতের আসাম রাজ্যের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে এই ডিজেল সরাসরি বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর ডিপোতে পাঠানো হচ্ছে।
ডিজেল পাম্পিং শুরু হয়েছে, বুধবার সন্ধ্যার মধ্যে সরবরাহ সম্পন্ন হবে
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ মঙ্গলবার (১০ মার্চ) নিশ্চিত করেছেন যে, সোমবার দুপুর ৩টা ২০ মিনিট থেকে ডিজেল পাম্পিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১১৩ মেট্রিক টন হারে পাম্পিং চললে বুধবার সন্ধ্যার মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ ডিজেলের সরবরাহ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই বিশেষ চালানটি দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি তেলের মজুদ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মৈত্রী পাইপলাইন: পরিবহন সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে
বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইনটি ভারতের শিলিগুড়ি মার্কেটিং টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের পার্বতীপুর পর্যন্ত প্রায় ১৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই পাইপলাইনটি ২০২৩ সালের মার্চ মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল সরাসরি পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। এর আগে ২০১৬ সাল থেকে রেল ওয়াগনের মাধ্যমে ভারত থেকে ডিজেল আনা হলেও পাইপলাইন চালু হওয়ার পর থেকে পরিবহন সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে।
দেশে ডিজেলের চাহিদা ও মজুত পরিস্থিতি
বাংলাদেশে বর্তমানে দৈনিক ডিজেলের স্বাভাবিক চাহিদা ১২ থেকে ১৩ হাজার মেট্রিক টন, যা দেশের সামগ্রিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই চাহিদা হঠাৎ বেড়ে ২০ হাজার মেট্রিক টনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ইতিমধেই বিভিন্ন যানবাহনের ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। বর্তমানে বিপিসির কাছে এক লাখ মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল মজুত রয়েছে, যা দিয়ে আগামী ১৬ থেকে ১৭ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
ভবিষ্যত পরিকল্পনা: আরও ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত রোববার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে ভারতের হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে আগামী চার মাসে অতিরিক্ত আরও ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সরকার আশ্বস্ত করেছে, নিয়মিতভাবে তেলের নতুন চালানগুলো দেশে পৌঁছাতে শুরু করলে তেলের সাময়িক সংকট পুরোপুরি কেটে যাবে। বর্তমান মজুত এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে আসা সরবরাহের সমন্বয়ে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে প্রশাসন।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারত থেকে নতুন এই চালান এবং পরবর্তীতে আরও আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে এবং বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
