সঞ্জু স্যামসন: অপেক্ষার পরিশ্রমে বিশ্বকাপ ফাইনালের নায়ক
সঞ্জু স্যামসন: অপেক্ষার পরিশ্রমে বিশ্বকাপ ফাইনালের নায়ক

সঞ্জু স্যামসন: অপেক্ষার পরিশ্রমে বিশ্বকাপ ফাইনালের নায়ক

সঞ্জু স্যামসনের ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলের প্রথম লাইনটি ছিল, ‘সম্ভবত ভারতের প্রথম উঁচুমানের খেলোয়াড়, যিনি জাতীয় দলের চেয়ে আইপিএলে বেশি পরিচিতি পেয়েছেন।’ এই লাইনটি এখন পাল্টানোর সময় এসেছে, কারণ এটি সম্পূর্ণ সত্য ছিল। ২০১৫ সালে ভারতের জার্সিতে অভিষেকের পর ১১ বছরে মাত্র ৬১ ম্যাচ খেলেছেন স্যামসন। অন্যদিকে, আইপিএলে এক যুগের বেশি ক্যারিয়ারে রান, ট্রফি, জনপ্রিয়তা—সবই পেয়েছেন। কিন্তু শান্তি খুঁজেছেন আকাশি-নীলে, আর ভারতের জার্সি ধরা দিয়েছে শরতের পেঁজা তুলোর মতো মেঘ হয়ে।

জাতীয় দলে স্থায়ী হওয়ার সংগ্রাম

স্যামসনের জাতীয় দলে খেলার ধারাবাহিকতা কখনোই নিশ্চিত ছিল না। আজ আছেন, কাল নেই—এই অবস্থা চলেছে বছরের পর বছর। অথচ ব্যাটসম্যানের জাত বিবেচনায়, তাঁর কাতার এখনো রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলিদের আশপাশে। আইপিএলে স্যামসনের ব্যাটিং দেখে আনন্দের চেয়ে বিস্ময়সূচক আফসোসই হয়েছে বেশি। এত দুর্দান্ত ব্যাটসম্যান কেন জাতীয় দলে নিয়মিত হতে পারেন না? পারেন না নাকি নেওয়া হয় না—এ নিয়ে বিস্তর তর্ক হতে পারে। কিন্তু ভারতের ব্যাটিং অর্ডারে স্থায়ী হওয়া দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি, কারণ এত বেশি তারকা রয়েছে দলে।

বিশ্বকাপে আবির্ভাব ও দায়িত্ববোধ

সুপার এইটে ভারতের বাঁচামরার ম্যাচে অপরাজিত ৯৭ রান করে ম্যাচসেরা হওয়ার পর স্যামসন বলেছিলেন, ‘জীবনের অন্যতম সেরা দিন।’ সেমিফাইনালে ৮৯ রান করে আবারও ম্যাচসেরা হন তিনি। দলকে সেমিফাইনাল ও ফাইনালে তোলায় তাঁর অবদানই সবচেয়ে বেশি। স্যামসন টের পাচ্ছেন, স্বপ্নপূরণ হওয়ায় শুধু আনন্দ নয়, দায়িত্বও বাড়ে। ‘স্পাইডারম্যান’ সিনেমার মতো—‘উইথ গ্রেট পাওয়ার কামস গ্রেট রেসপনসিবিলিটিজ।’ তিনি এখন ভারতের সুপারহিরো, যাঁর দাঁড়ানোর বেদি ছিল অপেক্ষার, আর বেড়ে ওঠার ভিত হয়েছে জাতীয় দলে আসা-যাওয়ার মধ্যে।

অতীতের বাদ পড়া ও বর্তমানের সাফল্য

২০২২ সালের মে মাসে ভারতের টি-টুয়েন্টি স্কোয়াড থেকে বাদ পড়লেন স্যামসন। তখনই বোঝা গিয়েছিল, সে বছর বিশ্বকাপের দলে তিনি বিবেচনায় নেই। ২০২৪ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে গোটা সময় কেটেছে ডাগআউটে। এবারের বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগেও বাদ পড়েছিলেন দল থেকে। অভিষেক শর্মার সঙ্গে ঈশান কিষানকে নিয়ে এগোচ্ছিল ভারত। কিন্তু এখন সেই স্যামসনই ওপেনিংয়ে ভারতের আশা-ভরসা। ক্রিকেট সত্যিই ভীষণ মজার খেলা! স্যামসনের অভিষেকের পর ভারত দুটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছে, চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালও খেলেছে দুবার—এর কোনোটিতেই স্যামসনকে দেখা যায়নি। বিধির বিধান তাঁকে এখন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালের দোরগোড়ায়।

ব্যাটিং-দর্শন ও ভবিষ্যৎ

স্যামসনের ব্যাটিং-দর্শন হলো, ‘আমি অনেক রান করতে আসিনি। অল্প কিছু রান করতে এসেছি, যেটা দলের কাজে লাগে।’ ভারতের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব বলেছেন, স্যামসন পরিস্থিতির দাবি মিটিয়ে খেলেছেন। সুপার এইটেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাঁচামরার ম্যাচে তাঁর ব্যাটিংটা তেমনই ছিল। যার পর সৌরভ গাঙ্গুলী বলেছেন, ‘সাদা বলে ভারতের হয়ে তাঁর নিয়মিত খেলা উচিত।’ স্যামসনের মাথায় আপাতত এসব ভাবনা নেই। অনেক দেরিতে তাঁর আবির্ভাব ঘটেছে ভারতীয় ক্রিকেটের মূল আলোয়। ফাইনালে দলকে জেতাতে না পারলে আগের দুটি ইনিংসের কোনো মূল্যই নেই—এই দায়িত্ববোধ এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন তিনি।

ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও প্রস্তুতি

টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর আগে স্যামসন বিশেষণের ধারেকাছেও ছিলেন না। তিনি ছিলেন ব্যাটের কাছে। জানতেন, বাইশ গজের খাতায় ভাগ্য পাল্টাতে ওটাই তাঁর ‘কলম’। তাই ধরনা দিয়েছিলেন যুবরাজ সিংয়ের কাছে, অনুশীলন করেছেন তাঁর অধীনে। পাশাপাশি মুক্তি নিয়েছিলেন চারপাশের জগৎ থেকে। স্যামসন বলেন, ‘সব দোর বন্ধ করে দিয়েছিলাম। ফোন বন্ধ রেখেছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছিলাম না, এখনো নেই। কম কথা, কমসংখ্যক মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ আমাকে সঠিক পথের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করেছে...নিজের বেসিকে ফিরে গিয়ে কাজ করেছি।’ স্যামসনের জীবনে সুযোগ আগেও এসেছিল, কিন্তু এবার ৩১ বছর বয়সে তিনি যে সুযোগ পেয়েছেন, সেটা পৃথিবীর অনেক ক্রিকেটার সারা জীবন খেলেও পাননি—বিশ্বকাপ ফাইনাল।