কলকাতায় বাংলা নববর্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রার বর্ণিল আয়োজন
কলকাতাসহ ভারতের বাংলাভাষী বিভিন্ন অঞ্চলে ১৫ এপ্রিল বুধবার বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়েছে। বাংলা ১৪৩৩ সালের প্রথম দিনটি ঘিরে দিনভর নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য ফুটে উঠেছে। দাবদাহ উপেক্ষা করে শত শত মানুষ শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দেন।
মঙ্গল শোভাযাত্রার বিস্তৃত পরিসর
কলকাতার বিভিন্ন স্থানে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়, যেখানে পাড়ায় পাড়ায় আয়োজন করা হয় শোভাযাত্রা ও উৎসবের। মিষ্টি বিতরণ, পান্তাভাত, ইলিশ ও খই-মুড়কি খাওয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী রীতিও পালন করা হয়। তবে, প্রতিবছর বাংলাদেশ উপহাইকমিশন নববর্ষ উপলক্ষে শোভাযাত্রা ও মেলার আয়োজন করলেও এবার তা হয়নি।
কলকাতায় দিনটি ঘিরে ‘পয়লা বৈশাখ হোক বাঙালিদের জাতীয় উৎসব’ স্লোগান উঠেছে, যদিও পশ্চিমবঙ্গ সরকার দিনটি ‘বাংলা দিবস’ হিসেবে পালন করছে। প্রধান মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা গবেষণা ও প্রসার কেন্দ্র’, যার কর্মকর্তা বুদ্ধদেব ঘোষ জানান, এবারের শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ছিল ‘বাঙালির নাগরিকত্বের সংকট’।
বিভিন্ন স্থানে শোভাযাত্রার বিস্তার
দক্ষিণ কলকাতার গাঙ্গুলিবাগান থেকে শুরু হয়ে যাদবপুরের সুকান্ত সেতু পর্যন্ত যায় প্রধান শোভাযাত্রাটি, যার উদ্বোধন করেন লোককবি আজিবর মণ্ডল। একই সংগঠনের উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গের আরও ১৩টি স্থানে শোভাযাত্রা হয়, যেমন:
- দিনহাটা
- রায়গঞ্জ
- বহরমপুর
- শ্রীরামপুর
- কল্যাণী
- মধ্যমগ্রাম
- কিষাণগঞ্জ
- মেদিনীপুর
- নামখানা
এছাড়া, দক্ষিণ কলকাতার ৮বি বাসস্ট্যান্ড থেকে ঢাকুরিয়া পর্যন্ত আরেকটি শোভাযাত্রা বের হয়।
বিশেষ আয়োজন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
কলকাতা ট্রাম ইউজার্স অর্গানাইজেশন নববর্ষে বিশেষ আয়োজন করে, যেখানে গোলপার্কের রামকৃষ্ণ মিশন এলাকা থেকে শোভাযাত্রা শুরু হয়ে গড়িয়াহাট ট্রাম ডিপোতে যায়। একটি ট্রাম সাজিয়ে বিশেষ ট্রামযাত্রার আয়োজন করা হয়, যা ধর্মতলা হয়ে শ্যামবাজার ঘুরে আবার গড়িয়াহাটে ফিরে আসে। ট্রামে স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।
কলকাতার ভাষা ও চেতনা সমিতি দিনভর কর্মসূচি পালন করে, রবীন্দ্র সদন এলাকার রাণুছায়া মঞ্চে কবিতা, গান ও নাটকের আয়োজন ছাড়াও দর্শনার্থীদের জন্য পান্তাভাত, শুঁটকি, আমপোড়া শরবত পরিবেশন করা হয়। ছবি আঁকা, ভাস্কর্য নির্মাণ, পুতুলনাচ ও নাচগানের অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হয়। সকাল ৮টায় পার্কস্ট্রিটের সরকারি আর্ট কলেজের সামনে থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়ে রবীন্দ্র সদনে গিয়ে শেষ হয়।
মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য
কলকাতায় ২০১৭ সাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়, যা ঢাকার আদলে চালু করা হয়েছে। করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালে শোভাযাত্রা হয়নি, কিন্তু এবার দক্ষিণ কলকাতার গাঙ্গুলিবাগান থেকে বড় শোভাযাত্রাটি বের হয় এবং যাদবপুরের সুকান্ত সেতু পর্যন্ত যায়। আরেকটি শোভাযাত্রা সেখান থেকে ঢাকুরিয়া পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়।
শোভাযাত্রায় কাঠের ঘোড়া, প্যাঁচা, ময়ূর, বাঘ, সিংহসহ নানা প্রতীক প্রদর্শিত হয়, সাথে পুরুলিয়া ও দক্ষিণ দিনাজপুরের মুখোশ, পটচিত্র, পাখা, কুলো, সরা ইত্যাদিও দেখা যায়। নৌকা, দোতারা, বাঁশি ও ঢোলের ব্যবহার এবং রাস্তাজুড়ে আঁকা আলপনা শোভাযাত্রাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। শিশু থেকে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সাজে অংশ নিয়ে নাচ, গান, আবৃত্তি ও নাটিকা পরিবেশন করে, এবং রায়বেশে, রণপা ও ঘোড়ার নাচও উপস্থিত ছিল। তবে, এবার বাংলাদেশের শিল্পীদের অংশগ্রহণ ছিল না বলে উল্লেখ করা হয়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে নতুন পঞ্জিকা অনুযায়ী নববর্ষ এক দিন আগে, অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল পালিত হয়েছে, যা কলকাতার উদযাপন থেকে ভিন্নতা দেখায়।



