চাঁদপুরে ঐতিহ্যবাহী সোলেমান লেংটার মেলা শুরু, প্রশাসনিক অনুমোদন নেই
চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার বেলতলী এলাকার বদরপুরে ঐতিহ্যবাহী ১০৭তম সোলেমান লেংটার মেলা প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়াই শুরু হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) থেকে মেলা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ভক্তদের আগাম উপস্থিতির কারণে সোমবার থেকেই কার্যক্রম চালু হয়ে যায়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এর আগে মেলা ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় এবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
মেলায় অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ
বিগত বছরগুলোতে এই মেলায় সহস্রাধিক গাঁজার দোকান, জুয়া, চাঁদাবাজি এবং অশ্লীলতার অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব কারণ উল্লেখ করে কয়েকটি সংগঠন মেলা বন্ধ রাখার দাবিতে প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদনও করেছে। সরেজমিনে মেলা ঘুরে দেখা গেছে, বেলতলী লঞ্চঘাট থেকে সাদুল্ল্যাপুর মোড় পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার জুড়ে মেলার বিস্তৃতি ঘটেছে। পুরো এলাকা জুড়ে বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট বসার পাশাপাশি ভক্তদের গান-বাজনা আয়োজনের জন্য অস্থায়ী আস্তানা গড়ে তোলা হয়েছে।
সোলেমান লেংটার মাজারের আশপাশে তার অনুসারীদের অন্তত ১৮ থেকে ২০টি মাজার এবং প্রায় দুই শতাধিক খানকা বা ভক্তদের আস্তানা রয়েছে। এসব স্থানে নারী-পুরুষ একসঙ্গে গান-বাজনার সঙ্গে নাচানাচিতে অংশ নিচ্ছেন। স্থানীয় বিভিন্ন পেশার মানুষ অভিযোগ করে জানান, এসব খানকার অনেকগুলোতেই গানের তালে তালে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের অশালীন নৃত্য অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাদের দাবি, শুধু খানকাতেই নয়, আশপাশের এলাকাজুড়েও কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই অশালীন নৃত্যসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলছে। তবে এসব বিষয়ে আপত্তি থাকলেও প্রতিবাদ করার মতো পরিবেশ বা সাহস তাদের নেই বলে জানান স্থানীয়রা।
খাদেমের বক্তব্য ও প্রশাসনের অবস্থান
সোলেমান শাহ (রহ.) এর মাজারের খাদেম মতিউর রহমান লাল মিয়া বলেন, ‘যেসব এলাকায় গাঁজার দোকান বসে, ওই জায়গাগুলো আমার নিয়ন্ত্রণাধীন না। তাই আমি এগুলো বন্ধ করতে পারছি না।’ নদীর তীরবর্তী এলাকায় ট্রলার ও লঞ্চ থেকে আসা যাত্রীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা আমার সীমানার বাইরের বিষয়। তাই এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে আমরা চাই, এই লেংটার মেলা বা ওরশকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনৈতিক কাজ বা চাঁদাবাজি না হোক। এ বিষয়ে আমি সবার সহযোগিতা চাই।’ মেলার অনুমতি না পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘অনুমতি না পাওয়ার বিষয়টি ঠিক আছে।’ তবে এত বড় আয়োজনে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে দায় কে নেবে—এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তিনি এড়িয়ে যান।
মতলব উত্তর উপজেলা পরিষদ মসজিদের খতিব মাওলানা এনামুল হক জানান, ‘ইসলামে মাদক, নারী-পুরুষের বেহালাপনা-অশ্লীলতা ইসলাম ধর্ম সমর্থন করে না। ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে ইসলাম পরিপন্থী কার্যক্রম পরিহার করা উচিত।’ মতলব উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘মেলার আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পোশাকধারী অর্ধশত পুলিশ সদস্য এবং সিভিল পোশাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যই এখানে কাজ করবে।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ‘মতলবের সোলেমান লেংটার মেলা অনেক বড় এবং বিশাল আকৃতির মেলা। জেলা প্রশাসন থেকে এখনো এই মেলার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। অনুমোদন পেলে এই মেলার শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কর্তৃপক্ষের সাথে আইনশৃঙ্খলা সভাকরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে ভূমিকা রাখা হবে।’
মেলার ঐতিহাসিক পটভূমি
উল্লেখ্য, পীর ও সাধক হযরত শাহ সুফি সোলায়মান (রহ.) ওরফে লেংটা বাবা বাংলা ১৩২৫ সালের চৈত্র মাসে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর থেকেই প্রতি বছর তার মাজারকে কেন্দ্র করে চৈত্রের ১৭ তারিখে ওরশ ও মেলার আয়োজন করা হয়। ‘লেংটার মেলা’ নামে পরিচিত এ আয়োজনে প্রতিবছর প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লক্ষাধিক লোক সমাগম ঘটে। তবে সোলেমান লেংটা তার জীবদ্দশায় কোন ভক্ত তৈরি করেননি। তার বাড়ি পার্শ্ববর্তী মেঘনা উপজেলায় হলেও তিনি মতলবের এই বদরপুরে বোনের বাড়িতেই থাকতেন। নিজের পূর্ব বাসনার কারণেই এখানে তাকে সমাহিত করা হয়।



