বান্দরবানে সাংগ্রাইং উৎসব নিয়ে উত্তেজনা: দুই কমিটির দ্বন্দ্বে আশঙ্কা
বান্দরবানে মারমা সম্প্রদায়ের প্রধান সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসব সাংগ্রাইং (বৈসাবি) উদ্যাপন নিয়ে নানা আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এবার একই স্থান ও একই সময়ে উৎসব আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি–সমর্থিত দুটি পৃথক কমিটি। এই ঘটনায় উৎসবে অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তির পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সমাজের নেতারা এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী উৎসবের ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সুশীল সমাজের হস্তক্ষেপ: আলোচনার আহ্বান
পরিস্থিতি সামাল দিতে মারমা সম্প্রদায়ের সুশীল সমাজের ৫৮ জন প্রতিনিধি উভয় পক্ষকে আলোচনায় বসার জরুরি আহ্বান জানিয়েছেন। চলতি ২৩ মার্চ উভয় পক্ষে চিঠি দিয়ে তাঁরা এই দাবি উত্থাপন করেন। চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, একই সময়ে রাজারমাঠে দুটি কমিটির উদ্যোগে উৎসব আয়োজন করলে মারাত্মক বিভ্রান্তি ও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ কারণে সামাজিক বিভাজন ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তাই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য দূর করে একটি সমন্বিত কমিটি গঠনের আহ্বান রইল।
কমিটির দ্বন্দ্ব: পুরোনো বনাম নতুন
তবে সুশীল সমাজের এই জরুরি আহ্বানে এখনো পর্যন্ত কোনো পক্ষ সাড়া দেয়নি। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের একজন মানবাধিকারকর্মী অং চ মং মারমা ব্যাখ্যা করেন, গত বছর সাংগ্রাইং উৎসব আয়োজনে দুই বছরমেয়াদি একটি কমিটি করা হয়েছিল। এরপরও চলতি ১২ মার্চ নতুন আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুরোনো কমিটির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন চ নু মং মারমা, আর নতুন কমিটির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন রাজপুত্র চ থুই প্রু। এই পরিস্থিতিতে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় তাঁরা উভয় পক্ষকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন।
আরেক স্বাক্ষরকারী সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান থোয়াইংচপ্রু মাস্টার বলেন, লিখিত আহ্বান জানানো হলেও এখনো কোনো পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য সাচিংপ্রু জেরীকেও অবহিত করা হয়েছে, তবে তাঁর পক্ষ থেকেও কোনো সাড়া মেলেনি।
উৎসব প্রস্তুতি: অনিশ্চয়তা ও বিলম্ব
আগামী ১৩ এপ্রিল থেকে চার দিনব্যাপী সাংগ্রাইং উৎসব শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সাধারণত এক মাসের বেশি সময় ধরে এই উৎসবের প্রস্তুতি চলে, কিন্তু দুই কমিটির দ্বন্দ্বের কারণে এখনো দৃশ্যমান কোনো প্রস্তুতি দেখা যায়নি। এই বিলম্ব উৎসবের সফল আয়োজন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে, যা স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে।
কমিটির প্রতিক্রিয়া: আলোচনার সম্ভাবনা
জানতে চাইলে পুরোনো কমিটির সভাপতি চ নু মং মারমা বলেন, তাঁরা আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পক্ষে। কেউ উদ্যোগ নিলে তাঁরা তা স্বাগত জানাবেন। অন্যদিকে নতুন কমিটির সভাপতি চ থুই প্রু বলেন, সরকার পরিবর্তন হলে স্বাভাবিকভাবে নতুন কমিটি হয়। এবারেও নতুন কমিটি সংসদ সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায় হয়েছে। তাঁর মাধ্যমে আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যা থাকলে সমাধান করা সম্ভব। সুশীল সমাজের নেতাদের সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের পথে যেতে হবে।
সংসদ সদস্যের বক্তব্য: নিরপেক্ষ অবস্থান
জানতে চাইলে বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিংপ্রু জেরী বলেছেন, পাল্টাপাল্টি কোনো উদ্যাপন কমিটি বলে কিছু নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একটি কমিটি হয়েছিল, নতুন সরকারের সময়ে নতুন কমিটি হয়েছে। এই কমিটিকে উৎসব আয়োজনে আগের মতো সবাই সহযোগিতা করবে। যদি উৎসব আয়োজন নিয়ে বসার প্রয়োজন হয়, সেটি কমিটি করবে। সেটি তাদের বিষয়, এতে সংসদ সদস্যের কোনো কিছু করার নেই। এই মন্তব্য উৎসবের আয়োজন নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে।



