ইরান সংকটে ট্রাম্পের 'বিজয়' প্রশ্নের মুখে, সাতটি কারণ বিশ্লেষণ
ইরান সংকটে ট্রাম্পের 'বিজয়' প্রশ্নের মুখে

ইরান সংকটে ট্রাম্পের 'বিজয়' দাবি নিয়ে সাতটি বড় প্রশ্ন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে গভীর সংকটে পড়েছেন। একদিকে তিনি নিজেকে জয়ী দাবি করছেন, অন্যদিকে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ তার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই সংঘাতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক পরিণতি এতটাই ভয়াবহ যে, যুদ্ধ থেকে সরে আসা কিংবা এতে টিকে থাকা, উভয় পথই এখন হোয়াইট হাউসের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও লিন্ডন জনসন বা জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো দীর্ঘস্থায়ী পরাজয়ের বৃত্তে ট্রাম্প এখনো পড়েননি, তবে বিপদের সংকেত সবখানেই স্পষ্ট। বিশেষ করে সাতটি প্রধান কারণে ট্রাম্পের এই তথাকথিত ‘বিজয়’ এখনও প্রশ্নের মুখে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশ্লেষণে এমন পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে।

হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা: যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ হারানোর উদাহরণ

যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ হারানোর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন লরেন্স ব্রেনান সিএনএন-কে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে না পারলে আপনি বিজয় দাবি করতে পারেন না। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি পুনরায় চালু করা অসম্ভব বললেই চলে।’ মাত্র কয়েকটি সস্তা ড্রোন ব্যবহার করে ইরান এই পথ বন্ধ রাখতে সক্ষম, যার কোনও সহজ সামরিক সমাধান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নেই।

নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন: শাসন পরিবর্তনের বাধা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর ধারণা করা হয়েছিল তেহরানে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে। কিন্তু তার ছেলে মোজতবা খামেনি স্থলাভিষিক্ত হওয়ায় ট্রাম্পের শাসন পরিবর্তনের বয়ান বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেক অচিনক্লস মনে করেন, নতুন এই নেতা তার বাবার চেয়েও বেশি কট্টরপন্থি।

ইসরায়েলের নিজস্ব লক্ষ্য: যৌথ সিদ্ধান্তে প্রশ্ন

ট্রাম্প রাজনৈতিক কারণে যুদ্ধ শেষ করতে চাইলেও ইসরায়েল তাতে রাজি হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। ইসরায়েল ইতোমধ্যে ইরানের তেল অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্যের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ‘যৌথ সিদ্ধান্তে’ যুদ্ধ শেষ করার যে কথা ট্রাম্প বলেছেন, তাতে প্রশ্ন উঠছে যে, মার্কিন কমান্ডারের সিদ্ধান্তের ওপর বিদেশি রাষ্ট্রের প্রভাব কতটুকু?

অস্পষ্ট যুদ্ধের বয়ান: বিজয় কাহিনী তৈরিতে বাধা

হোয়াইট হাউস থেকে যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে একেক সময় একেক কথা বলা হচ্ছে। কখনও বলা হচ্ছে এটি পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের জন্য, কখনোবা ব্যালিস্টিক মিসাইল দমানোর জন্য। এই অস্পষ্টতা একটি সুসংগত ‘বিজয় কাহিনী’ তৈরিতে বাধা দিচ্ছে।

পারমাণবিক প্রশ্ন: ইরানের আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়নি

ট্রাম্প দাবি করেছেন তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থার মতে, ইস্পাহান কেন্দ্রে এখনও প্রায় ২০০ কেজি উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। বিশেষ বাহিনী পাঠিয়ে এই তেজস্ক্রিয় পদার্থ উদ্ধার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর জন্য বিশাল পদাতিক বাহিনী প্রয়োজন। এগুলো ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত ইরানের পরমাণু আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

অভ্যন্তরীণ স্থবিরতা: গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের স্বপ্ন অধরা

যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প ইরানি জনগণকে ‘মুক্তির সময় এসেছে’ বলে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেখানে গণঅভ্যুত্থানের কোনও চিহ্ন নেই। বরং আশঙ্কা করা হচ্ছে, হামলা থামলে দেশটির সরকার আরও কঠোরভাবে ভিন্নমত দমন করবে। ফলে ট্রাম্পের কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে।

মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনরোষ: জনপ্রিয়তায় ধসের আশঙ্কা

তেলের দাম বৃদ্ধিকে সাময়িক কষ্ট বলে প্রশাসন দাবি করলেও সাধারণ মার্কিনিরা তা সহজভাবে নিচ্ছেন না। বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ভার্জিনিয়া ও মিশিগানে সাম্প্রতিক সহিংসতা, যেটিকে যুদ্ধের ছায়া বলে অনেকে মনে করছেন, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নামাতে পারে। সাতজন মার্কিন সেনার মৃত্যু এবং সামরিক সরঞ্জাম হারানো সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করছে।

বিজয় নাকি দীর্ঘস্থায়ী ফাঁদ? সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খোঁজা

অপারেশন এপিক ফিউরি-কে ব্যর্থ বলার সময় হয়ত এখনও আসেনি। কারণ মার্কিন-ইসরায়েল বিমান হামলায় ইরানের হুমকি তৈরির সক্ষমতা এবং ড্রোন-মিসাইল তৈরির কারখানাগুলো অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ইতিহাস বলছে, ১৯৪৫ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র খুব কম যুদ্ধেই নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। সামরিক শক্তির সুবিধা ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই ট্রাম্পকে একটি সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খুঁজতে হবে।