ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে জাল ভোটের জেরে সংঘর্ষ, ৩০ জন আহত
নাসিরনগরে জাল ভোটের জেরে সংঘর্ষ, ৩০ আহত

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে জাল ভোটের জেরে সংঘর্ষ, ৩০ জন আহত

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় সংসদ নির্বাচনে জাল ভোট ও কারাদণ্ডের জের ধরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) বেলা ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

ঘটনার পটভূমি ও উত্তেজনার সূত্রপাত

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গোয়ালনগর ইউনিয়নে বিএনপির সমর্থক রহিম তালুকদারের লোকজন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনে জয়ী বিএনপির প্রার্থী এম এ হান্নানের পক্ষের লোক। একই ইউনিয়নের কাশেম মিয়া ও তার লোকজন ওই আসনে দলের ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ কে এম কামরুজ্জামান মামুনের অনুসারী। ভোটের দিন সকালে গোয়ালনগর উচ্চবিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে জাল ভোট দেওয়ার প্ররোচনার অভিযোগে এম এ হান্নানের পক্ষের সমর্থক জিয়া মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে আটক করেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ১০ দিনের কারাদণ্ড দেন।

তিন দিন আগে জিয়া মিয়া কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে এলাকায় ফেরেন। তার সন্দেহ ছিল, স্বতন্ত্র প্রার্থী এ কে এম কামরুজ্জামান মামুনের পক্ষের সমর্থক শিশু মিয়া সেনাবাহিনীর কাছে তথ্য দিয়ে তাকে গ্রেফতারে সহযোগিতা করেছিলেন। এই সন্দেহ থেকে সোমবার বিকালে শিশু মিয়াকে মারধর এবং তার মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। এ নিয়ে মঙ্গলবার সকাল থেকে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়।

সংঘর্ষের বিস্তারিত ও আহতদের অবস্থা

বেলা ২টার দিকে কাশেম মিয়া পক্ষের লোকজন গোয়ালনগর স্কুলপাড়া জামে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোকজন জড়ো করেন। কাশেমের পক্ষের লোকজন একইভাবে ইউনিয়নের লালুয়ারটুক জামে মসজিদ থেকেও সংঘর্ষে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। পরে লালুয়ারটুক এলাকার একটি ইটভাটা থেকে ট্রাকে করে ইটের খোয়া এনে হামলায় ব্যবহার করা হয়। একপর্যায়ে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। খবর পেয়ে নাসিরনগর থানা ও চাতলপাড় ফাঁড়ির পুলিশের সদস্যরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। সংঘর্ষে আহতরা নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

স্থানীয় নেতা ও পুলিশের বক্তব্য

এ বিষয়ে জানতে রহিম তালুকদার ও কাশেম মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি। গোয়ালনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজহারুল হক বলেন, ‘দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকে বিরোধ ছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাল ভোট দেওয়া নিয়ে সন্দেহ ও ভুল বোঝাবুঝি থেকেই রহিম তালুকদার ও কাশেম মিয়ার পক্ষের মধ্যে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সংঘর্ষের সময় আমি এলাকায় ছিলাম না। মসজিদের মাইকের ঘোষণার বিষয়টি আমি শুনিনি। তবে বড় আকারে সংঘর্ষ হয়েছে। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন আর না ঘটে সে ব্যাপারে দুই পক্ষকে বোঝানো হচ্ছে।’

নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিনুর ইসলাম বলেন, ‘রহিম তালুকদার ও কাশেম মিয়ার পক্ষের মধ্যে আগে থেকে বিরোধ চলে আসছিল। পূর্ববিরোধে উভয় পক্ষের মধ্যে একাধিক ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝির ঘটনা ঘটেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই পক্ষ দুই দিকে অবস্থান করেছিল। পূর্ববিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনও পক্ষ থানায় অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এলাকাবাসীরা জানিয়েছেন, সংঘর্ষের পর থেকে গোয়ালনগর ইউনিয়নে ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের তৎপরতায় উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হলেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।