চাঁদপুরের রূপসা দক্ষিণে ৫৫ বছর ধরে নারী ভোটাররা ভোট দেননি, এবার বিশেষ উদ্যোগ
চাঁদপুর-৪ ফরিদগঞ্জ আসনের রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারী ভোটাররা গত ৫৫ বছর ধরে পীরের অনুরোধ মেনে ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন না। মাঝে মধ্যে কিছু নারী ভোটার ভোট দিলেও তা ছিলো নামেমাত্র। ফলে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চাঁদপুর জেলা প্রশাসন ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছেন। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নারীদের ভোটের জন্য নারী ম্যাজিস্ট্রেটসহ সব কর্মকর্তা নারী নিয়োগ করা হয়েছে।
পীরের অনুরোধে দীর্ঘদিনের ভোট বর্জন
জানা গেছে, ৭০ দশকের জৈনপুরের পীরের অনুরোধ মেনে রূপসা দক্ষিণের নারীরা ওই এলাকার কোনো ভোটের সময়েই ভোট দিতে যান না। মাঝে মধ্যে দুএকটি ভোটের সময় প্রার্থীদের কাছের আত্মীয়রা ভোট দিলেও তার পরিমাণ ছিল নামমাত্র। যদিও ভোট ছাড়া আর বাকী সব কাজেই ওই ইউনিয়নের নারীদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। তারা হাট-বাজারসহ যাবতীয় সবকাজে বিচরণ করেন।
ভোট না দেওয়া প্রসঙ্গে স্থানীয় এক নারী ভোটার জানান, 'ভোট দেওয়া নিষেধ তো। আমরা কখনও আসলে দেই নাই আর কি।' আরেক জন বলেন, 'আগে হুজুরে মানা করা হয়েছে, এ কারণে দেওয়া হয় নাই।' অনেকে আবার পরিবারের রীতি অনুযায়ী ভোট দেননি। 'ছোটবেলা থেকেই কখনও দেখি নাই যে আমাদের মা-কাকিরা ভোট দিয়েছেন। এই ইয়ে (রীতি) অনুযায়ী আমরা কখনও ভোট দিতে হয় নাই,' বলে জানান রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের আরেক নারী ভোটার।
জেলা প্রশাসনের ব্যাপক উদ্যোগ
তবে এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চাঁদপুর জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম সরকার নারীদের পর্দা নিশ্চিত করে যেকোনো মূল্যে নারীদের ভোট দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নেন। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে রূপসা দক্ষিণের ইউনিয়নের মোট ৮টি কেন্দ্রের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ওই ইউনিয়নে মোট নারী ভোটার সংখ্যা ১০ হাজার ২৯৯ জন।
সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়নের ৮টি কেন্দ্রে নারী ভোটের জন্য ২০টি বুথ তৈরি করা হয়েছে। ওই বুথ গুলোর জন্য সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে নারীদের নিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পুলিশ, আনসার ভিডিপি এবং ৮টি কেন্দ্রের জন্য একজন নারী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে।
প্রচারণা ও আশাবাদ
এছাড়া ৮ জন প্রার্থীকে ওই বুথগুলোতে নারী পোলিং এজেন্ট নিয়োগ দেওয়ার জন্য চিঠি ও মৌখিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইউএনও সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, 'নারীদের পর্দা মেনে ভোট দেওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ওই ইউনিয়নে ইতোমধ্যেই ব্যপক প্রচারণার মাধ্যমে জানানো হয়েছে। আশা করছি এবার নারীরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে ভোট কেন্দ্রে আসবেন।'
এই উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, প্রশাসনের এই পদক্ষেপ নারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত করবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের সম্পৃক্ততা বাড়াবে।
