হৃদযন্ত্রের প্রাকৃতিক পেসমেকার তৈরিতে ঐতিহাসিক সাফল্য চীনের
হৃদরোগ গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন চীনের বিজ্ঞানীরা। তারা বিশ্বের প্রথমবারের মতো গবেষণাগারে সফলভাবে তৈরি করেছেন সিনো-অ্যাট্রিয়াল (এসএ) নোড, যা হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ হিসেবে পরিচিত। এই সাফল্য ভবিষ্যতে হৃদরোগ গবেষণা, নতুন ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং প্রচলিত ইলেকট্রনিক পেসমেকারের বিকল্প হিসেবে জৈবিক পেসমেকার তৈরির পথ সুগম করতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
সিনো-অ্যাট্রিয়াল নোড কী?
সিনো-অ্যাট্রিয়াল (এসএ) নোডকে হৃদযন্ত্রের ‘প্রাকৃতিক পেসমেকার’ বলা হয়। হৃদযন্ত্রের ডান অলিন্দে অবস্থিত এই ক্ষুদ্র অংশটি বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে, যা হৃদস্পন্দনকে নিয়মিত ও সচল রাখে। স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা এসব বৈদ্যুতিক সংকেত হৃদযন্ত্রের ওপরের ও নিচের প্রকোষ্ঠগুলোকে সমন্বিতভাবে সংকোচন ও প্রসারণ করতে নির্দেশ দেয়। ফলে সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিকভাবে বজায় থাকে। তবে এসএ নোডে কোনো ধরনের ত্রুটি দেখা দিলে হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে ধীর হয়ে যেতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম বন্ধও হয়ে যেতে পারে, যা জীবনহানির কারণ হতে পারে।
কীভাবে তৈরি করা হলো?
এসএ নোডের কার্যপ্রণালি এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রোগ সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানার উদ্দেশ্যে চীনা গবেষকরা মানবদেহের প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল ব্যবহার করে ত্রিমাত্রিক একটি গবেষণাগারভিত্তিক মডেল তৈরি করেন। গবেষকদের দাবি, এই কৃত্রিমভাবে তৈরি কাঠামোটি প্রাকৃতিক এসএ নোডের আচরণ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে অনুকরণ করতে সক্ষম। এমনকি এটি কোনো বাহ্যিক উদ্দীপনা ছাড়াই নিজস্ব ছন্দে স্পন্দন তৈরি করতে পারে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ল্যাবে তৈরি এই মডেলটি হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক পেসমেকারের মতোই কাজ করে। ফলে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হৃদস্পন্দনের বিভিন্ন সমস্যা ও রোগ নিয়ে গবেষণার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
হৃদরোগ গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্ভাবন অনিয়মিত হৃদস্পন্দনজনিত রোগ নিয়ে গবেষণাকে আরও এগিয়ে নেবে। বাস্তবসম্মত একটি গবেষণাগার মডেল থাকায় নতুন ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতির কার্যকারিতা ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার আগেই আরও নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া মানব হৃদযন্ত্রে বৈদ্যুতিক সংকেত কীভাবে তৈরি হয় এবং কীভাবে তা নিয়ন্ত্রিত হয়, সে বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
জৈবিক পেসমেকার তৈরির সম্ভাবনা
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভবিষ্যতে জৈবিক পেসমেকার তৈরির সম্ভাবনা। গবেষকদের ধারণা, এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দনে ভোগা রোগীদের জন্য নতুন চিকিৎসার দ্বার খুলে যেতে পারে এবং প্রচলিত ইলেকট্রনিক পেসমেকারের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন, তবুও এই অর্জনকে হৃদরোগবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।



