মণিপুরে দুই সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করলেন মুখ্যমন্ত্রী খেমচাঁদ সিং
মণিপুরে দুই সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক

মণিপুরে দুই সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করলেন মুখ্যমন্ত্রী খেমচাঁদ সিং

ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে প্রায় দুই বছর ধরে চলমান সংঘাতের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিলেন নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং। তিনি মেইতেই এবং কুকি-জো সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বৈঠক করেছেন, যা ২০২৩ সালে সংঘাত শুরুর পর এই প্রথম সর্বোচ্চ পর্যায়ের এমন একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

প্রযুক্তির সাহায্যে মানসিক দূরত্ব কমানোর প্রয়াস

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়, যাতে মুখ্যমন্ত্রী একই সময়ে দুই পক্ষের কথা শুনতে পারেন। কুকি-জো অধ্যুষিত পার্বত্য অঞ্চল এবং মেইতেইদের উপত্যকার মধ্যে বিদ্যমান মানসিক দূরত্ব দূর করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তাঁর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, এই প্রচেষ্টা আপাতত সফল হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আবেগঘন মুহূর্তে কান্নায় ভেঙে পড়েন অংশগ্রহণকারীরা

মুখ্যমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে ইম্ফল পশ্চিমের লাঙ্গোল অল্টারনেট হাউজিং কমপ্লেক্সে বসে উদ্বাস্তু মেইতেই পরিবারের সঙ্গে অনলাইনে কথা বলেন। একই সময়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি চুড়াচাঁদপুর এবং কাংপোকপিতে আশ্রিত কুকি-জো বাস্তুচ্যুত মানুষের সঙ্গেও যুক্ত হন। বৈঠকের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত আবেগপূর্ণ।

মুখ্যমন্ত্রী যখন মেইতেই ও কুকি-জো জনগণের ব্যক্তিগত দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনছিলেন, তখন অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। মনিপুর ও মিয়ানমারের মধ্যবর্তী মোরে সীমান্ত শহরে নিজের বাসস্থানে ফিরে যাওয়ার আকুতি শোনা যায় এক মেইতেই নারীর কণ্ঠে। পাশাপাশি, শিক্ষার সহায়তা চাওয়া এক কুকি কিশোরী বলেন, সে অবিলম্বে তার পড়াশোনা শুরু করতে চায়, যা দুই বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে।

মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ও সরকারি পদক্ষেপ

মুখ্যমন্ত্রী বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি আপনাদের চোখের জল বৃথা যেতে দেব না।’ তিনি গত দুই বছরের সহিংসতাকে একটি ‘দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে বর্ণনা করে আবার ‘মণিপুরি হওয়ার চেতনা’ সবার মধ্যে নতুন করে গড়ে তোলার আহ্বান জানান। চলমান মানবিক সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যেই বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে।

  • সরাসরি ৩৩ কোটি টাকা আর্থিক অনুদান উদ্বাস্তুদের দেওয়া হয়েছে।
  • বিছানা ও তোশক কেনার জন্য মাথাপিছু ২ হাজার ৪২০ টাকা করে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
  • যাঁদের ঘরবাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে, সেই সব পরিবারকে এক লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে।
  • গৃহহীনদের জন্য আবাসন প্রকল্প ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা চলছে।

চিকিৎসা ও শিক্ষার জন্য বিশেষ উদ্যোগ

কুকি-জো সম্প্রদায়ের মানুষ যাতে বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজনে মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলে যেতে পারেন, বৈঠকে সেই লক্ষ্যে ‘নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। এছাড়াও, প্রায় ৮ হাজার কুকি-জো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে বলে জানানো হয়। তাদের সহায়তায় বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হবে, বিশেষ করে যে ৬ হাজার শিক্ষার্থী অন্য রাজ্যে পড়াশোনা চালাতে পারছে না, তাদের জন্য একটি ‘বিশেষ পরিকল্পনা’র প্রস্তাব দেন মুখ্যমন্ত্রী।

সংঘাতের বর্তমান অবস্থা ও আশার আলো

কুকি-জো ও মেইতেই গোষ্ঠীর মধ্যে দুই বছরের টানা সংঘর্ষে প্রায় ৩০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, ঘরবাড়ি হারিয়েছেন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। সংঘাত যে একেবারে মিটে গিয়েছে, তা এখনো বলা যাবে না। ইতিমধ্যে কুকি ও নাগাদের উপগোষ্ঠীর মধ্যেও নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। তবে সপ্তাহখানেক আগে নতুন মুখ্যমন্ত্রী খেমচাঁদ সিং দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছুটা আশা সঞ্চারিত হয়েছে বলে মনিপুরের সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে।