নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি: জিয়াউর রহমানের পথে ফেরা, ভারতে ভিসা বন্ধের অবসান কবে?
জিয়াউর রহমানের পথে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি

নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি: জিয়াউর রহমানের ধারায় ফেরার ঘোষণা

১৮ মাস পর বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার এই সময়ে আগের সরকারের পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে এসে একটি ভিন্ন পথ অনুসরণ করেছে। বিশেষ করে ভারত থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো হয়েছে। একইসঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। এই নীতিগত পরিবর্তন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকালের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির পুনরুজ্জীবন

সদ্য দায়িত্ব নেওয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, "আমরা জিয়াউর রহমান সাহেবের পররাষ্ট্রনীতিতে ফিরে যাচ্ছি।" অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এই চেষ্টা অব্যাহত ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে নতুন বাংলাদেশের যে কথা বলা হচ্ছে, তা মূলত পুরোনো পররাষ্ট্রনীতির দিকে প্রত্যাবর্তনকেই নির্দেশ করে।

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি ভারতের সঙ্গে অতিরিক্ত নির্ভরতা হ্রাস করে পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সক্রিয়ভাবে উন্নত করেন। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে প্রায় ৭৩৫ মিলিয়ন ডলার মার্কিন সহায়তা পেয়েছিল বাংলাদেশ এই নীতির ফলেই।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন ও ভিসা বন্ধ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পালাবদলের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে, যা শেষ পর্যন্ত স্থবিরতায় পৌঁছায়। তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বেশ কয়েকবার স্বীকার করেছেন যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থবির হয়ে আছে। সম্পর্কের এই টানাপড়েন এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে শেষ পর্যন্ত ভিসা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা ৫ আগস্টের পর থেকে এখনও বন্ধ রয়েছে। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত দ্রুত ভিসা চালু করার কথা বলছে।

সার্কের ধারণা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা

জিয়াউর রহমানের আমলে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। তার নীতির লক্ষ্য ছিল ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আধিপত্য ও অধীনতা থেকে সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তিতে রূপান্তরিত করা। এই সময়েই সার্কের ধারণা তৈরি হয়। ১৯৮০ সালে তিনি এই ধারণার জন্ম দেন এবং ১৯৮৫ সালে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) হিসেবে তা আত্মপ্রকাশ করে।

নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা

বিএনপি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনে জয়লাভের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এই কথা উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে, এমন প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, "বাংলাদেশ এবং এ দেশের মানুষের বৃহত্তর স্বার্থকে রক্ষা করে আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করবো।" একইসঙ্গে তিনি সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার কথাও বলেছেন।

ভারতের সঙ্গে টানাপড়েন চলছে ১৮ মাসের বেশি সময় ধরে। সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টার মতে, এক ধরনের স্থবিরতা ছিল সম্পর্কে। বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় ভারতকে বেশ সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি ফোন করে কথা বলেছেন। ঢাকায় শপথ অনুষ্ঠানে লোকসভার স্পিকারকে পাঠিয়েছেন চিঠি দিয়ে, সেখানে তিনি পরিবারসহ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, "ফরেন পলিসিতে ‘প্রথম বাংলাদেশ’ মানে বাংলাদেশের স্বার্থ কোনোভাবেই খণ্ডিত না হয়, বা নষ্ট না হয় সেটা। বিএনপির বা জিয়াউর রহমানের যে পররাষ্ট্রনীতি, সেটা তিনি বাস্তবায়ন করতে চেষ্টা করবেন বলে মনে হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে।" তিনি আরও যোগ করেন, আগের পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে কিংবা নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে কী হবে, সেটা দেখতে একটু অপেক্ষা করতে হবে।

ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, "কতগুলো জিনিস কোনোভাবেই আমরা চাইলেও পরিবর্তন করতে পারবো না। বিশ্ব একটা বহুমাত্রিক কাঠামোর দিকে যাচ্ছে। আমাদের অর্থনীতির যে কাঠামো, সেখানে ওই বহুমাত্রিক কাঠামোর সঙ্গে আমরা সম্পৃক্ত।" তিনি জোর দিয়ে বলেন, পররাষ্ট্রনীতিতে পেশাদারত্বের বিশাল দরকার আছে এবং কোনও দেশের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে যেন তৃতীয় দেশের ওপর নির্ভরতা না থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

সিলেটে ভারতের সহকারী হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাস জানিয়েছেন, সব ধরনের ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে। এতে স্পষ্ট যে ভারত সম্পর্কের উন্নতি চায়। সাবেক কূটনীতিকদের মতে, ভারতের সঙ্গে সমান সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে, স্বার্থ রক্ষা করে কাজ করতে হবে এবং তাড়াহুড়ো করে কোনও কাজ করা উচিত হবে না।