রাজধানীতে টানা বৃষ্টিতে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রুটি বিক্রেতা রানী বেগম ও জুতা মেরামতকারী খোকন দাসের মতো হাজারো মানুষ বৃষ্টি উপেক্ষা করেও দোকান খুলছেন, কিন্তু ক্রেতা না থাকায় আয় প্রায় শূন্য। সংসারের চাকা সচল রাখতে তারা প্রতিদিনই বের হন, কিন্তু আয়ের অভাবে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।
রানী বেগমের রুটি বিক্রি: বৃষ্টিতে আয় কমেছে
রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বর সেকশনের ফুটপাতে ছোট্ট একটি দোকান রানী বেগমের। প্রতিদিন তিনি আটার রুটি, ডাল, সবজি ও ডিমভাজি বিক্রি করেন। আজ শনিবার দুপুরে বৃষ্টির কারণে তাঁর দোকানে কোনো ক্রেতা দেখা যায়নি। ক্রেতাদের বসার জন্য রাখা লোহার বেঞ্চটি ফাঁকাই পড়ে ছিল। মাথার ওপর টাঙানো ত্রিপলের ফুটো দিয়ে টুপটাপ করে বৃষ্টির পানি পড়ছিল। নিজের গায়ে পানি পড়া নিয়ে যেন তাঁর কোনো ভাবনাই নেই; বরং কষ্ট করে বানিয়ে রাখা রুটিগুলো ভিজে যাওয়ার আশঙ্কায় কাচের বাক্সটি পুরোনো একটি ব্যানার দিয়ে ঢেকে দিলেন তিনি। অপেক্ষা করতে থাকলেন বৃষ্টি থেমে যাওয়া ও ক্রেতা আসার।
বেলা দেড়টার দিকে কথা হয় রানী বেগমের সঙ্গে। তিনি জানালেন, বৃষ্টির কারণে সারা দিনই বেচাবিক্রি প্রায় বন্ধ। কিন্তু তাই বলে দোকান বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। সংসারের চাকা তো থেমে থাকে না। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি হইলেই কি, দোকান তো খুলতেই হইব। পেটে তো খিদা আসে। দোকান না খুললে খামু কী?’
সংসারের দায়িত্ব একা কাঁধে
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার বাসিন্দা রানী বেগম এখন থাকেন ঢাকার মিরপুরের জনতা আবাসিক এলাকায়। সংসারে আছেন স্বামী কাঞ্চন মিয়া, বৃদ্ধ মা ফাতেমা বেগম ও ছেলে সাজু মিয়া। ছেলের স্থায়ী কোনো কাজ নেই। কখনো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান, কখনো মিষ্টির দোকানে কাজ করেন। স্বামীর সঙ্গে মিলেই এত দিন দোকান চালাতেন রানী। কিন্তু গত রমজানে স্বামীর স্ট্রোক হওয়ার পর থেকে তিনি আর কাজে ফিরতে পারেননি। এখন পুরো সংসারের দায়িত্ব প্রায় একাই কাঁধে তুলে নিয়েছেন রানী।
রানী বেগমের দিন শুরু হয় ফজরের আজানের সঙ্গে। ঘুম থেকে উঠে প্রথমে ডাল আর সবজি রান্না করেন। এরপর রুটি বানানোর জন্য আটা মেখে প্রস্তুত করেন। সব কাজ শেষ করে খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে চলে আসেন মিরপুর-২ নম্বরে বাংলাদেশ-জার্মান কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সামনে। সেখানেই বিকেল পর্যন্ত রুটি বানিয়ে বিক্রি করেন। প্রতিটি রুটি ১০ টাকা, ডাল বা সবজি ১০ টাকা এবং ডিমভাজি ২০ টাকায় বিক্রি করেন তিনি।
আয় কমেছে, খরচ একই
দিন ভালো গেলে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকার বেচাবিক্রি হয়। তবে গতকাল শুক্রবার সারা দিনের বৃষ্টিতে দোকানই খুলতে পারেননি। আর আজ সকাল ছয়টা থেকে দুপুর পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩৭০ টাকা। রানী বললেন, আগে সকালেই সাত কেজি আটা মেখে আনতেন। পরে দোকানেই আরও পাঁচ কেজির মতো আটা মাখতে হতো। এখন পুরো দিন মিলিয়েই চার থেকে পাঁচ কেজি আটার রুটি বিক্রি হয়।
স্বামীর চিকিৎসার খরচের কথাও বললেন রানী। তিনি বলেন, ‘ওর ওষুধে মাসে অনেক টাকা লাগে। খরচ অনেক, আমি জানি না। কারণ পোলা-মাইরাই ওষুধ কিনে দেয়। আর আমার কেনা লাগে মায়ের প্রেশারের ওষুধ। মাসে প্রায় ৭০০ টাকার মতো লাগে।’
একটু থেমে রানী বেগম বললেন, ‘কষ্ট তো অনেক। কিন্তু কষ্টের কথা ভাবলে তো চলবে না। যত দিন শরীরে শক্তি আছে, তত দিন কাজ করতেই হইব। এক দিন দোকান না খুললে সেদিনের বাজারটাই বন্ধ হয়ে যায়। তাই বৃষ্টি, রোদ যেমনই হোক, সকালে বের হই।’
খোকন দাসের জুতা মেরামত: ‘একটা টাকাও কামাই হয়নি’
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। ফুটপাতের গাছের নিচে কাঠের ছোট্ট একটি পাটাতনে জড়সড় হয়ে বসে আছেন খোকন দাস। মাথার ওপর পুরোনো একটি ছাতা। বেলা গড়িয়ে দুপুর হলেও তাঁর সামনে কোনো ক্রেতা আসেননি। তাই কখনো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথচারীদের দিকে, কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি।
বৃষ্টিতে কাজ কমায় আয় কমেছে খোকন দাসের। কিন্তু কাজ না করলে সংসার চলবে না। তাই প্রতিদিন জুতা পলিশ ও মেরামতের সরঞ্জাম নিয়ে বসছেন তিনি। রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে সড়কের পাশেই বসে জুতা-ব্যাগ মেরামত ও পলিশের কাজ করেন খোকন। আজ সকাল নয়টায় দোকান খুলেছিলেন। তখন আকাশ মেঘলা থাকলেও বৃষ্টি ছিল না। তবে সকাল ১০টার পর থেকে থেমে থেমে কয়েক দফা বৃষ্টি নামে। ক্রেতা না থাকায় কাজের সুই, সুতা, কালি কিংবা ব্রাশ—কোনোটিই আর বের করেননি।
দুপুরে কথা হয় খোকন দাসের সঙ্গে। তখনো তাঁর এক টাকাও আয় হয়নি। আগের দিনও সারা দিনে কাজ হয়েছিল মাত্র ২২০ টাকার। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘এহনো একটা পয়সাও কামাই হয় নাই। কালকে হইছিল মাত্র ২২০ টাকার মতো। দিন যদি এরম থাকে, বাঁচমু কেমনে? আমগো তো দিনে দিনে কাম কইরা খাইতে হয়।’ দিন ভালো গেলে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, কখনো এক হাজার থেকে বারো শ টাকারও কাজ হয় বলে জানালেন তিনি।
সংসারের চাপ ও ভবিষ্যৎ চিন্তা
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার বাসিন্দা খোকন দাস। প্রায় ২৮ বছর ধরে ঢাকার ফুটপাতে বসে জুতা মেরামতের কাজ করছেন। মিরপুর-৭ নম্বর সেকশনের একটি ভবনের নিচতলার এক কক্ষের বাসায় স্ত্রী চন্দনা দাস ও বড় মেয়ে প্রিয়াঙ্কা দাসকে নিয়ে থাকেন। সেই ঘরের ভাড়া মাসে ৭ হাজার টাকা। স্ত্রী একসময় পোশাক কারখানায় কাজ করলেও প্রায় দেড় বছর ধরে বেকার। বড় মেয়ে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। মেজ মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট ছেলে সাগর দাস গ্রামের বাড়িতে নানির কাছে থেকে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
বড় মেয়ে নিজের বেতনের কিছু টাকা ভবিষ্যতে বিয়ের জন্য জমাচ্ছেন। পাশাপাশি গ্রামের বাড়িতে থাকা ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচও পাঠান। মেয়ের বিয়ের কথাও ভাবছেন খোকন। হিসাব কষে দেখেছেন, খুব সাধারণভাবে বিয়ে দিলেও আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা লাগবে। সেই টাকা অল্প অল্প করে জমাচ্ছেন। কিন্তু কয়েক দিন আয় না হলে সংসার চালাতেই সেই সঞ্চয়ে হাত দিতে হয়।
কথা বলতে বলতেই বারবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছিলেন খোকন দাস। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘আর যে কইদিন এমন থাকব, আল্লাহই জানে। রইদ হোক, বৃষ্টি হোক, ঘরে বইসা থাকার উপায় নাই। দোকানে আইসা বসি, যদি একটা-দুইটা কাজ আহে। কিন্তু সারা দিন বইসা থাইকাও খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হইলে খুব কষ্ট লাগে। সংসারের খরচ, ঘরভাড়া, মাইয়ার বিয়া—সবকিছুর চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরে।’



