জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধিতে আকাশপথের ভাড়া আকাশছোঁয়া, যাত্রী ও এয়ারলাইনস বিপাকে
জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধিতে আকাশপথের ভাড়া আকাশছোঁয়া

জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধিতে আকাশপথের ভাড়া আকাশছোঁয়া, যাত্রী ও এয়ারলাইনস বিপাকে

দফায় দফায় জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক আকাশপথের ভাড়া এক লাফে আকাশ ছুঁয়েছে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রুটের প্রতিটি টিকিটে যাত্রীদের আগের তুলনায় গড়ে অন্তত দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক রুটেও টিকিটপ্রতি গড়ে ৫ হাজার টাকার বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। এতে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সম্ভাবনাময় এভিয়েশন খাত ভয়াবহ সংকটে পড়েছে।

দেশে জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধির হার অস্বাভাবিক

এদিকে, বাংলাদেশে দাম বেড়ে গেলেও ভারত ও নেপালে এখনো জেট ফুয়েলের মূল্য অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে পাকিস্তানে সাড়ে ২৪ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি। এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) সাধারণ সম্পাদক ও নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, "দেশে জ্বালানির কোনও ঘাটতি নেই। গত ২২ দিনে প্রায় ২৫টি তেলবাহী জাহাজ এসেছে এবং প্রায় আগের দামে জ্বালানি সংগ্রহ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এই মূল্যবৃদ্ধি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।"

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সুপারিশ

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, "এভিয়েশন খাতকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে বিশেষ ভর্তুকি বা করছাড়ের কথা ভাবতে হবে। বিশেষ করে জেট ফুয়েলের ওপর বিদ্যমান ট্যাক্স ও ভ্যাট কমিয়ে দাম সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। পাশাপাশি ডলার সংকটের এই সময়ে এয়ারলাইনসগুলোর জন্য বিশেষ এলসি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি ও অন্যান্য চার্জ পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।" তিনি আরও যোগ করেন, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তেলের দাম কমিয়ে ভাড়া কমাতেই হবে, না হলে যাত্রীদের পাশাপাশি এয়ারলাইনস মালিকরাও বিপাকে পড়বেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধির চিত্র

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে জেট ফুয়েলের দাম লিটারপ্রতি বেড়েছে ১০৭ টাকা। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা করা হয়েছে, অর্থাৎ লিটারপ্রতি বেড়েছে ৮৯ টাকা ৮৮ পয়সা। আন্তর্জাতিক রুটে প্রতি লিটার শূন্য দশমিক ৭৩৮৪ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৩২১৬ ডলার করা হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭০ টাকার বেশি বৃদ্ধি। বিইআরসি বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্ল্যাটসের গড় দর, ডলার বিনিময় হার ও পরিবহন ব্যয় বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় জেট ফুয়েলের দাম বাড়ানো হয়েছে।

ভাড়া বৃদ্ধির প্রত্যক্ষ প্রভাব

অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ভাড়ায় এর প্রভাব সুস্পষ্ট। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার কিংবা সৈয়দপুর—সব রুটেই টিকিটের ন্যূনতম দাম এখন সাধারণের নাগালের বাইরে। আগে যেখানে ঢাকা-সৈয়দপুর বা ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকায় টিকিট পাওয়া যেত, বর্তমানে সেখানে ন্যূনতম ৬ থেকে ৭ হাজার টাকার নিচে টিকিট মিলছে না। শেষ মুহূর্তের টিকিটের ক্ষেত্রে এই দাম ১০ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক রুটেও একই চিত্র—ঢাকা থেকে কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, জেদ্দা, রিয়াদসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতে যাত্রীদের ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।

এয়ারলাইনসগুলোর অবস্থা

বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, জেট ফুয়েলের দাম বাড়ার কারণে তাদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা জানিয়েছে, গত এক বছরে জ্বালানির দাম যে হারে বেড়েছে, সে অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয় না করলে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না। একটি এয়ারলাইনসের পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৫০ শতাংশই জ্বালানি খাতে ব্যয় হয়। ফলে জেট ফুয়েলের এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি অপারেশনাল খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে কম লাভজনক রুটে ফ্লাইট কমানো বা বন্ধ করার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া

আকাশপথের নিয়মিত যাত্রী ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান বলেন, "জরুরি প্রয়োজনে সপ্তাহে তিন দিন সৈয়দপুর যেতে হয়। আগে যে টাকা দিয়ে যাওয়া-আসা করতাম, এখন সেই টাকা দিয়ে একদিকের টিকিটও হচ্ছে না। বিমানের ভাড়া ট্রেনের তুলনায় চার-পাঁচ গুণ বেশি হয়ে গেছে।" একই অভিজ্ঞতার কথা জানান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রাজু আহমেদ। তিনি বলেন, "আগামী সপ্তাহে পরিবারের চার সদস্য নিয়ে কক্সবাজার যাওয়ার কথা ছিল। একটি এয়ারলাইনস থেকে টিকিট কিনতে গিয়ে দেখি নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে প্রায় ৮ হাজার টাকা বেশি লাগছে। পরে বাধ্য হয়ে বিমানে যাওয়া বাদ দিয়েছি।"

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক তুলনা

সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক রুটে বাংলাদেশের নির্ধারিত জেট ফুয়েলের মূল্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় অনেক বেশি। বিভিন্ন বিমানবন্দর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কলকাতায় প্রতি লিটার শূন্য দশমিক ৬২ ডলার, মাস্কাটে শূন্য দশমিক ৬০৩ ডলার, দুবাইয়ে শূন্য দশমিক ৫৮৭ ডলার, জেদ্দায় শূন্য দশমিক ৫৮১ ডলার এবং দোহায় শূন্য দশমিক ৫৮৪ ডলার। দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাংককে ১ দশমিক ০৯৮ ডলার এবং সিঙ্গাপুরে শূন্য দশমিক ৫৮৬ ডলার দরে জেট ফুয়েল সরবরাহ করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের তুলনায় কম।

ভবিষ্যৎ শঙ্কা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আকাশপথ শুধু বিলাসিতা নয়, বরং একটি দেশের অর্থনৈতিক গতির অন্যতম চালিকাশক্তি। জেট ফুয়েলের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও এয়ারলাইনসগুলোকে নীতিগত সহায়তা না দিলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আকাশপথের বাজার ছোট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে, পাশাপাশি গোটা পরিবহনব্যবস্থা ও পর্যটনশিল্প গভীর সংকটে নিমজ্জিত হতে পারে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের জনসংযোগ মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বলেন, "জেট ফুয়েলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেশের এভিয়েশন খাতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। খরচ ব্যবস্থাপনা এখন এয়ারলাইনসগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।"