সিন্ডিকেটের চাপে দেশ ছাড়লেন নবীন ফ্যাশনের মালিক
রাজধানীর মগবাজারে কম দামে পাঞ্জাবি বিক্রির কারণে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের চাপ, হুমকি ও দোকান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনার পর শেষ পর্যন্ত ব্যবসা গুটিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নবীন ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাফেজ এনামুল হাসান নবীন। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) রাতে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ফেসবুক পোস্টে মর্মস্পর্শী বার্তা
পোস্টে এনামুল হাসান নবীন লিখেছেন, "সিংহের মতো বাঁচতে চাই। কিন্তু সিন্ডিকেটের গুলিতে সন্তানদের এতিম করতে চাই না। তাই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হয়তো একদিন দেশে ফিরব ইনশাআল্লাহ।" এই মর্মস্পর্শী বার্তায় তিনি নিজের নিরাপত্তা ও পরিবারের ভবিষ্যত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত অভিযোগ
এর আগে একই দিন রাজধানীর মগবাজারের বিশাল সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, কম দামে পণ্য বিক্রির কারণে তাকে ভয়ভীতি ও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, "মগবাজার দিয়ে আসার সময় অনেক ভয়ে ছিলাম। কেউ আবার শহীদ ওসমান হাদির মতো আমাকে গুলি করে না দেয়, সেই ভয়ে গাড়ির জানালার পর্দা নামিয়ে এসেছি। এত ভয় নিয়ে আমি এ দেশে কেন ব্যবসা করব? ইনসাফভিত্তিক কাজের জন্য যদি বাধার সম্মুখীন হতে হয়, তবে আমি ব্যবসা বন্ধ করে আবার প্রবাসে ফিরে যাব।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন নম্বর থেকে তাকে ফোন করে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাকে বলা হচ্ছে, ভিডিও ফুটেজ মুছে ফেলতে হবে, না হলে তার অন্যান্য ব্যবসাও বন্ধ করে দেওয়া হবে। "তারা বলছে, ভিডিও যা আছে ডিলিট করে দাও। নইলে, ব্যবসা একটা বন্ধ করে দিয়েছি, আরও যেগুলো আছে সেগুলোও বন্ধ করে দেব," বলেন তিনি।
ব্যবসার পেছনের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
নিজের ব্যবসা সম্পর্কে এনামুল হাসান নবীন জানান, তিনি একজন প্রবাসী উদ্যোক্তা। করোনার সময় দেশে ফিরে ব্যবসা শুরু করেন। তার প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ছিল ন্যায্যমূল্যে গ্রাহকদের ভালো মানের পণ্য সরবরাহ করা। তিনি দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় দরিদ্র মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা হয় এবং এখানে প্রতিবন্ধী, হিজড়া সম্প্রদায় ও মাদকাসক্তি থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিরা কাজ করেন। সরবরাহকারীরাও সেই কারণে কম দামে পণ্য দেন, যার ফলে তারা ৩০০ টাকায় পাঞ্জাবি ও পাজামা বিক্রি করতে সক্ষম হন।
সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ
তিনি অভিযোগ করেন, পাশের দোকান ‘প্রিন্স’-এর মালিক মাইকেলসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পুলিশসহ তার দোকান বন্ধ করে দেয় এবং ক্রেতাদেরও হেনস্তা করা হয়। তাদের দাবি ছিল, ওই মার্কেটে চার হাজার ৫০০ টাকার কমে পাঞ্জাবি এবং এক হাজার ৫০০ টাকার কমে পাজামা বিক্রি করা যাবে না।
সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, "আমরা অনেক বাধার সম্মুখীন হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করি। কিন্তু সরকার থেকে কোনো সহযোগিতা পাই না। সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করতে গেলেও ভয়ভীতি দেখানো হয়।"
ঘটনার পটভূমি
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার (২০ মার্চ) রাজধানীর মগবাজার এলাকায় ‘নবীন ফ্যাশন’ নামের একটি দোকান কম দামে পাঞ্জাবি বিক্রির কারণে আশপাশের ব্যবসায়ীদের আপত্তির মুখে পড়ে। প্রতিবেশী দোকানদাররা এ ধরনের বিক্রিকে ‘রিলিফ দেওয়ার’ সঙ্গে তুলনা করে বিরোধিতা করেন। পরে পুলিশের সহায়তায় বিকালে জোরপূর্বক দোকানটি বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
এই ঘটনার পরই পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়ার ঘোষণা দেন উদ্যোক্তা এনামুল হাসান নবীন। এই সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, যা বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার প্রশ্ন তুলে ধরছে।



