ইরানি নারী ফুটবলারদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের ছায়া
অস্ট্রেলিয়ায় চলমান এএফসি নারী এশিয়ান কাপ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ইরান জাতীয় নারী ফুটবল দলের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। সম্প্রতি ইরানের এক রাষ্ট্রপন্থি ভাষ্যকার খেলোয়াড়দের 'যুদ্ধকালীন বিশ্বাসঘাতক' হিসেবে অভিহিত করার পর এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়দের ইরানে ফেরত না পাঠিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সুযোগ দেওয়ার জন্য দেশটির সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ইরানের প্রথম ম্যাচটি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স'-এ ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের উপস্থাপক মোহাম্মদ রেজা শাহবাজি অভিযোগ করেন, দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের আগে জাতীয় সংগীত না গেয়ে দলটি দেশকে অসম্মান করেছে। তিনি খেলোয়াড়দের 'বিশ্বাসঘাতক' বলে অভিহিত করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। যদিও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ শুরুর আগে ইরানের খেলোয়াড়রা জাতীয় সংগীত গেয়েছেন এবং সালাম জানিয়েছেন, যা আগের ম্যাচের আচরণের চেয়ে ভিন্ন ছিল।
ঝুঁকির মুখে ইরানি নারী ফুটবলাররা
শরণার্থী পরিষদের প্রধান নির্বাহী পল পাওয়ার বলেন, 'যে প্রমাণগুলো পাওয়া যাচ্ছে তার ভিত্তিতে বলা যায়, যদি তাদের ইরানে ফিরিয়ে দেওয়া হয় তবে নারী ফুটবল দলের সদস্যরা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।' তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইরানে খুব সাধারণ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়া মানুষরাও ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়েছে। জার্মানিভিত্তিক ইরানি সাংবাদিক আলি বোরনাইও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক্সে প্রকাশিত ভিডিওটির সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওংকে ট্যাগ করে খেলোয়াড়দের সুরক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, ইরানে 'রাষ্ট্রদ্রোহ' একটি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। যদি এই খেলোয়াড়দের জোর করে দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তবে তারা ইচ্ছামতো আটক এবং মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
অস্ট্রেলিয়ার সরকারি অবস্থান
এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ান সরকার দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ইরানের সাহসী জনগণের পাশে রয়েছে। তিনি বলেন, 'তারা নির্মম সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের শিকার হয়েছে। বিশেষ করে নারীরা শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা নিপীড়নের মুখে পড়েছে। আমরা ইরানের সরকারকে আহ্বান জানিয়েছি যেন তারা নিজেদের জনগণকে সুরক্ষা দেয় এবং প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সুযোগ দেয়।' ওং আরও বলেন, 'আমরা আশা করি এএফসি নারী এশিয়ান কাপে ইরান দলের অংশগ্রহণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের তরুণ ইরানিদের অনুপ্রাণিত করবে, যাতে তারা নারীদের অধিকার এবং খেলাধুলায় অংশগ্রহণকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।' অন্যদিকে, মানবিক অভিবাসন কর্মসূচির দায়িত্বে থাকা অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা
এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, বিশেষ করে নারী অধিকার ও ক্রীড়াবিদদের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর।
- ইরানি নারী ফুটবলারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অস্ট্রেলিয়ার সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
- খেলাধুলাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের সুর উঠছে।
- এই ঘটনা ইরানে নারী ক্রীড়াবিদদের চ্যালেঞ্জগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মোটকথা, এএফসি নারী এশিয়ান কাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি ইরানি নারী ফুটবলারদের জন্য নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার লড়াইয়ের একটি মঞ্চে পরিণত হয়েছে। তাদের ভবিষ্যৎ এখন অস্ট্রেলিয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক চাপের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে।
