অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়া বেড়েছে ৮ গুণ
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যাংকিং খাত থেকে নেট ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৮ গুণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে নেওয়া নেট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৩,০৩৫ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ৯,৪৪২ কোটি টাকা।
সরকারের মোট ঋণের ৮১ শতাংশ ব্যাংকিং খাত থেকে
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারের মোট অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ৮১ শতাংশই এসেছে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে। এই সময়ে সরকারের মোট নেট ঋণ নেওয়ার পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০,০০০ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, ব্যাংক থেকে সরকারের অত্যধিক ঋণ নেওয়া বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে এবং সুদের হার বাড়ার চাপ তৈরি করতে পারে। এই পরিস্থিতি এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে যখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ইতিমধ্যেই রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ঋণ বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণগুলো
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন।
- কম্বাইন্ড ইসলামী ব্যাংককে মূলধন সহায়তা: পাঁচটি ব্যাংক একত্রিত করে গঠিত 'কম্বাইন্ড ইসলামী ব্যাংক'-কে সরকারের মূলধন সহায়তা প্রদান একটি প্রধান কারণ। গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সরকার এই ব্যাংকে প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকা ইনজেকশন দিয়েছে, যার বড় একটি অংশ ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিয়ে অর্থায়ন করা হয়েছে।
- রাজস্ব সংগ্রহে ঘাটতি ও ব্যয় বৃদ্ধি: চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে রাজস্ব সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে থাকার পাশাপাশি সরকারের কার্যকরী ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ব্যাংকিং খাতের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়েছে।
বাজেট ঘাটতি ও ঋণ পরিকল্পনা
সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৭.৯০ লাখ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে, যার সামগ্রিক ঘাটতি (অনুদানসহ) ২.২১ লাখ কোটি টাকা বা জিডিপির ৩.৫ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১.২৫ লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, যার মধ্যে ১.০৪ লাখ কোটি টাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে এবং ২১,০০০ কোটি টাকা অ-ব্যাংকিং উৎস থেকে নেওয়ার কথা ছিল।
তবে বর্তমান তথ্য ঋণ নেওয়ার ধারায় একটি তীব্র পরিবর্তন নির্দেশ করছে।
- অ-ব্যাংকিং উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৭,২১৬ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৫,৮৬৪ কোটি টাকা।
- জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ঋণের মোট স্টক দাঁড়িয়েছে ১০.৩৭ লাখ কোটি টাকা, যা এক বছরের মধ্যে ১.৫১ লাখ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ কমেছে
প্রতিবেদনে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার দিকটিও তুলে ধরা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বৈদেশিক উৎস থেকে নেট ঋণ নেওয়ার পরিমাণ ছিল মাত্র ৯,৮৩২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১১ শতাংশেরও কম। বিপরীতে গত অর্থবছরের একই সময়ে সরকার বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় ২৭,৯৬৪ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছিল।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আহ্বান
বিশেষজ্ঞরা বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে একটি সুষ্ঠু ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশলের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তারা বলছেন, সরকারের ব্যাংকিং খাত থেকে অত্যধিক ঋণ নেওয়া বেসরকারি খাতকে সংকুচিত করে ফেলতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকিস্বরূপ। একটি ভারসাম্যপূর্ণ ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।



