জাতীয় যাকাত ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল করতে ৫-৭ সদস্যের কমিটি গঠনের উদ্যোগ
বাংলাদেশে যাকাত ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর ও সুশৃঙ্খল করতে একটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, যাকাত ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য পাঁচ থেকে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হতে পারে, যেখানে ধর্মমন্ত্রী সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
কমিটির গঠন ও উদ্দেশ্য
প্রস্তাবিত কমিটিতে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিবসহ ইসলামী অর্থনীতি বিষয়ে দেশ-বিদেশের কয়েকজন বিশেষজ্ঞকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। এই কমিটির মূল কাজ হবে যাকাতের অর্থ কীভাবে আরও কার্যকরভাবে বণ্টন করা যায় এবং দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে তা কীভাবে প্রত্যক্ষভাবে কাজে লাগানো সম্ভব—এসব বিষয়ে সুপারিশ তৈরি করে সরকারের কাছে উপস্থাপন করা। শায়খ আহমাদুল্লাহ জানান, যাকাতের বিষয়ে মতামত ও পরামর্শ জানতে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যা থেকে এই উদ্যোগের সূত্রপাত হয়েছে।
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের সাফল্য ও মডেল
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন গত ছয়–সাত বছর ধরে যাকাত নিয়ে কাজ করছে এবং উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। শুধুমাত্র গত এক বছরের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয় করে ২১০০ বেকার তরুণ–তরুণীকে বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বর্তমানে ওই তরুণরা বছরে প্রায় ৪২ কোটি টাকা আয় করছে, যা যাকাতের অর্থ দিয়ে দক্ষতা উন্নয়ন বা স্বাবলম্বী করার মাধ্যমে স্থায়ী দারিদ্র্য বিমোচনের একটি কার্যকর মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
যাকাত ব্যবস্থাপনার বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনা
শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, বর্তমানে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে যেভাবে যাকাত দিচ্ছেন তা চলবে, তবে এর পাশাপাশি যেসব দাতব্য প্রতিষ্ঠান যাকাত সংগ্রহ করছে, সেগুলোকে একটি নীতিগত কাঠামোর আওতায় আনলে এবং কার্যকারিতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা গেলে যাকাত ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত হবে। তিনি উল্লেখ করেন, শুধু ওআইসিভুক্ত দেশগুলোতেই বছরে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ যাকাত আদায় হয়। এই বিপুল সম্ভাবনার একটি অংশও যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে তা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে।
দারিদ্র্য বিমোচনে দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি
দরিদ্র মানুষকে সাময়িকভাবে কিছু অর্থ দিয়ে দারিদ্র্য দূর করা যায় না বলে মন্তব্য করেন শায়খ আহমাদুল্লাহ। বরং তাদের দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করলে দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সরকার সবার কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে যাকাত আদায় করবে— এমন কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি, বরং স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে যাকাত ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এ বিষয়ে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ) বলেন, যাকাতের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করা যায় সে বিষয়ে মতবিনিময় হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যাকাত ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হবে এবং এতে দেশের দরিদ্র মানুষ উপকৃত হবে। কমিটি গঠনের সময়সীমা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন থাকায় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হবে। কমিটি কীভাবে যাকাত ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা যায় সে বিষয়ে সুপারিশ দেবে। যাকাত যেহেতু সারা বছরই দেওয়া যায়, তাই কমিটি দ্রুত কাজ শুরু করলে এ বছর থেকেই কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ থাকতে পারে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে যাকাত ব্যবস্থাপনার একটি সুসংহত কাঠামো গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলছে, যা দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।



