অমর একুশে বইমেলার পঞ্চম শিশুপ্রহরে শিশুদের উচ্ছ্বাস
আজ শুক্রবার সকালে অমর একুশে বইমেলার পঞ্চম শিশুপ্রহর উদযাপিত হয়েছে। সকাল থেকেই মেলায় ভিড় জমাতে শুরু করে নানা বয়সী শিশুরা। কেউ এসেছে মা–বাবার হাত ধরে, কেউ দাদার সঙ্গে, আর কেউ পরিবারের বড়দের সান্নিধ্যে। শিশুপ্রহরটি বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়, যার পর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা উন্মুক্ত থাকে সবার জন্য। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত গ্রন্থানুরাগীরা মেলায় আসেন বলে জানা গেছে।
বইয়ের জগতে শিশুদের বিস্ময়
মেলার ভেতরে ঢুকেই শিশুদের চোখে পড়ে নতুন এক জগৎ। সারি সারি বইয়ের স্টল, রঙিন প্রচ্ছদ, গল্প আর কল্পনার ভান্ডার—সবকিছুই যেন বিস্ময়ে ভরিয়ে দেয় ছোটদের মন। কেউ খুঁজছে রূপকথা, কেউ ছড়ার বই, আবার কেউ আগ্রহ নিয়ে দেখছে বিজ্ঞানভিত্তিক শিশুতোষ বই। অনেক শিশুর এটাই প্রথম বইমেলায় আসা, তাই বইয়ের পাহাড় দেখে তাদের চোখেমুখে ছিল আনন্দ আর কৌতূহলের ছাপ।
পাপেট শো ও গল্প পাঠের মোহনীয় আয়োজন
শিশুপ্রহরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পাপেট শো। বেলা ১১টায় কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের মঞ্চে শুরু হয় এই আয়োজন। ছোট ছোট রঙিন পুতুল—কখনো পাখি, কখনো বনজ প্রাণী—আর তাদের মজার গল্পে মুহূর্তেই জমে ওঠে মঞ্চের সামনে। শিশুরা গোল হয়ে বসে মন দিয়ে দেখতে থাকে পুতুলের অভিনয়। গল্পের ভেতর দিয়ে উঠে আসে সততা, বন্ধুত্ব আর পরিবেশ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
পুতুল নাটকের অংশ হিসেবে মঞ্চস্থ হয় তিনটি গল্প—‘বনভ্রমণ’, ‘অপু দীপুর গল্প’ এবং ‘বল্টু মামা ও তার সাঙ্গপাঙ্গ’। শিশুদের সামনে গল্পগুলো উপস্থাপন করে পাপেট আলো এবং ব্লু। এছাড়া গল্প পাঠ করেন গল্প পাঠক কাজী শামস তাথৈ ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির প্রশিক্ষক মোনামী ইসলাম কনক। তাঁদের প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় গল্পগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে শিশুদের চোখের সামনে।
বায়োস্কোপে শিশুদের কৌতূহল
পাপেট থিয়েটারের মঞ্চের পাশে বসানো হয় দুটি বায়স্কোপ। সেখানে হঠাৎ ভেসে আসে ডাক—‘এই বায়োস্কোপ, বায়োস্কোপ!’ হাঁক শুনে কৌতূহলী শিশুদের ছোট ছোট পা এগিয়ে যায় রঙিন এক বাক্সের সামনে। ডাক দিচ্ছিলেন দয়াল চন্দ্র, যিনি কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের একজন সদস্য। তার বায়োস্কোপের ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে আরেকটি ছোট্ট গল্পের দুনিয়া।
বাক্সের গোল কাচে চোখ লাগিয়ে একে একে দেখতে শুরু করে শিশুরা। বায়োস্কোপে চলছে ‘কুঁজো বুড়ির গল্প’। সেই গল্প দেখছে জাহিয়া চৌধুরী রাহা, তাইয়েবার মতো শিশুরা, যারা মা–বাবার সঙ্গে এসেছে। বায়োস্কোপ দেখে মুগ্ধ হয় ছোট্ট জাহিয়া চৌধুরী রাহা, যার চোখে যেন বিস্ময়ের ঝিলিক।
অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া ও শিশুদের আনন্দ
উত্তরা থেকে বইমেলায় এসেছে ছোট্ট পাঠক ফারিহা কবির। তাকে নিয়ে এসেছেন তার মা সুরাইয়া আক্তার, যিনি পেশায় শিক্ষক। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই মেয়েকে বইয়ের সঙ্গে পরিচিত করানোর ইচ্ছা থেকেই তাকে মেলায় নিয়ে আসা। গত বছরও এসেছিলেন তারা। ঘুরে ঘুরে মেয়ের পছন্দের কয়েকটি গল্প, ছড়া আর ভূতের গল্পের বইও কিনে দিয়েছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, বইয়ের সঙ্গেই শিশুর কল্পনার জগৎ সবচেয়ে সুন্দরভাবে গড়ে ওঠে।
মোহাম্মদপুর থেকে মা–বাবার সঙ্গে এসেছে দুই বোন নিপা ও দিপা। তাদের বাবা জায়াউল হক, পেশায় একজন ব্যাংকার। তিনি জানান, টেলিভিশনে পাপেট শোর কথা শুনে দুই মেয়েই খুব আগ্রহী হয়ে ওঠে। তারপর থেকেই মেলায় এসে পাপেট শো দেখার জন্য বায়না করছিল তারা। পাপেট শো দেখে দারুণ খুশি নিপা, সে বলে পুতুল অপু আর দিপুর গল্প তার খুব ভালো লেগেছে।
শিশুপ্রহরের শিক্ষামূলক দিক
কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা আসাদুজ্জামান আশিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা গল্পে গল্পে শিশুদের প্রাণ ও প্রকৃতির যত্ন নেওয়ার কথা বলছি। কীভাবে লাগাতে হয় গাছ, গাছের যত্ন নিতে হবে, প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা। পারস্পরিক বন্ধুত্ব এবং প্রতিটি গল্পে বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করা হয়।’
অভিভাবকদের মতে, বইয়ের প্রতি ভালোবাসা গড়ে তোলার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো শৈশব। তাই গল্প, পুতুল আর আনন্দের মাধ্যমে শিশুদের বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এই আয়োজন শিশুদের কল্পনার জগৎকে আরও সমৃদ্ধ করছে। শিশুপ্রহরের এই আয়োজন শুধু বিনোদনের জন্য নয়—এর ভেতরে রয়েছে শেখার আনন্দও, যা ছোটদের মনে বইয়ের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলছে।
