অমর একুশে বইমেলা ২০২৬: রমজান ও অর্থনৈতিক চাপে ভিন্ন রূপ, প্রকাশকদের সতর্কতা
একুশে বইমেলা ২০২৬: রমজানে ভিন্ন চিত্র, প্রকাশকদের সংকট

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬: প্রতিকূলতার মধ্যেই শুরু, এখন অন্তিম পর্যায়ে

নানা প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে এই মেলা তার সমাপ্তির দিকে এগিয়ে চলেছে। এটি মনে রাখা জরুরি যে, একুশে বইমেলা মূলত একুশে ফেব্রুয়ারি, ভাষা আন্দোলন ও মাথা নত না করার চেতনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য মাসে বিভিন্ন আকারের বা আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজন করা যেতে পারে এবং সেটা প্রয়োজনও বটে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও বইমেলা হওয়া উচিত। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসের একুশে বইমেলা আমাদের নিজস্ব, স্বকীয় একটি আয়োজন। এই মেলা কতদিন চলবে— তিন সপ্তাহ, চার সপ্তাহ নাকি পুরো মাসজুড়ে, সেটা আলাদা বিতর্কের বিষয়। তবে একুশের বইমেলা ফেব্রুয়ারি মাসেই হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই সাংস্কৃতিক প্রশ্নে আমাদের আপস করার কোনো সুযোগ নেই বলেই মনে হয়।

রমজান ও অর্থনৈতিক চাপ: বইমেলায় ক্রেতার দুরবস্থা

যাই হোক, মেলা শুরু হয়েছে এবং সেটা এখনও চলমান। অনেকের আশঙ্কা ছিল যে, রমজান মাসের কারণে মেলায় ক্রেতার উপস্থিতি কমে যেতে পারে। বাস্তবেও সেই চিত্রই প্রতিভাত হচ্ছে। পত্রিকার খবরে দেখা গেছে, শপিং মলে ক্রেতার ভিড় থাকলেও বইমেলা অনেকাংশেই উপেক্ষিত রয়ে গেছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায়, এবং রোজার মাসের নানাবিধ খরচ ও উপচারের কারণে মানুষের হাতে নগদ অর্থের সংকট দেখা দিয়েছে। সামনে ঈদুল ফিতর থাকায় মানুষ সেজন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তেল সংকটের মতো সমস্যাও মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। উপরন্তু, বাজারদরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বইয়ের দামও বেড়ে গেছে। এই সবকিছু মিলে বই কেনার প্রবণতা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।

নতুন বই কম, কিন্তু মানসম্মত বই খোঁজার শ্রেষ্ঠ সময়

এই বইমেলায় নতুন বইয়ের সংখ্যা কম এসেছে, এটা সত্য। তবে মেলার এই শেষ পর্যায়ে পুরাতন কিন্তু প্রয়োজনীয় ও ভালো বই খুঁজে নেওয়ার জন্য এখনই উপযুক্ত সময়। সাধারণত ভিড়ের মেলায় অনেক দরকারি বই আলোর নিচে চাপা পড়ে যায়। কিন্তু এই ছিমছাম পরিবেশে হঠাৎ করেই সেইসব রত্ন খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এবারের বইমেলা আগেরবারগুলোর চেয়ে বেশ কিছু দিক থেকে আলাদা— সজ্জা, বিন্যাস এবং লোকসমাগমের ক্ষেত্রে।

মেলার ছয়টি উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ

  1. অতিরিক্ত প্যাভিলিয়নের অনুপস্থিতি: এবারের মেলায় অতিরিক্ত বিলাসী ও অপ্রয়োজনীয় বড় প্যাভিলিয়নগুলো দেখা যাচ্ছে না। ফলে সব স্টল সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়েছে। কারও একটি স্টল, আবার কারও চারটি স্টল রয়েছে। বইমেলায় এমন বৈষম্য না থাকাই ভালো। যার আর্থিক সামর্থ্য বেশি, তার স্টল সংখ্যায় বেশি হবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু প্যাভিলিয়নের মাধ্যমে সেই বৈষম্য নগ্নভাবে প্রদর্শন না করাই উত্তম।
  2. ছিমছাম পরিবেশ: বইমেলা চমৎকারভাবে ছিমছাম ও সুশৃঙ্খল। এটি সজ্জার কারণে নাকি ভিড় না থাকার কারণে হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে ভিড় যে কম, সেটা স্পষ্ট। এতে প্রকৃত বইক্রেতারা উপকৃত হচ্ছেন।
  3. প্রকৃত ক্রেতাদের উপস্থিতি: দর্শকের সংখ্যা ভীষণভাবে কমে গেলেও যারা আসলেই বই কিনতে আগ্রহী, তারা মেলায় আসছেন। অনেকের হাতেই ভারী বইয়ের ব্যাগ দেখা যাচ্ছে। তবে এই সংখ্যা আগেরবারের তুলনায় নিঃসন্দেহে কম। ঢাকার বাইরের বড় ক্রেতারা সম্ভবত এবার আসেননি।
  4. অনলাইন বিক্রির বৃদ্ধি: স্টলে বসে অনেককেই নিষ্ক্রিয় দেখা গেলেও অনলাইনে বই ক্রয় কম নয়, বরং ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। অবশ্য এটি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কিছু প্রকাশকের দৃশ্যমান উপস্থিতি বেশি, তাদের অনলাইন বিক্রিও তুলনামূলকভাবে বেশি।
  5. বিক্রির সাফল্যের রহস্য: যেসব প্রকাশকের বইয়ের কন্টেন্ট ভালো, উপস্থাপনা আকর্ষণীয় এবং অঙ্গসজ্জা মানসম্মত, তাদের বিক্রি তুলনামূলকভাবে ভালো হচ্ছে। বই শেষ পর্যন্ত একটি পণ্য, এবং সেভাবেই এর মূল্যায়ন করতে হবে।
  6. মৌসুমি পাঠক ও লেখকের অনুপস্থিতি: মৌসুমি পাঠকের ঢল না থাকায় মৌসুমি লেখকরাও অনুপস্থিত। বিপরীতক্রমটিও সত্য। মৌসুমি প্রকাশকরা এখনও আছেন, কিন্তু ধারণা করা যায় যে তারা আগামী দুই-তিন বছর পর টিকে থাকতে পারবেন না।

মেলার ভৌগোলিক বিন্যাস ও অন্যান্য দিক

বইমেলার মূলত দুটি ভৌগোলিক অংশ দেখা যাচ্ছে— একটি লেকের পশ্চিম পাড় এবং অন্যটি দক্ষিণ পাড়। বেশিরভাগ নামকরা প্রকাশক পশ্চিম পাড়ে অবস্থান করছেন, কারণ তারা পরে মেলায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যারা আগে থেকেই অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, তারা দক্ষিণ পাড়ে রয়েছেন। কিন্তু ক্রেতাদের সমাগম বেশি হচ্ছে পশ্চিম পাড়েই। অনেকে বলছেন, লোকজন টিএসসি গেট দিয়ে ঢুকছে, তাই তারা বেশি ভেতরে যাচ্ছে না। তবে ব্যাপারটি শুধু সেটাই নয়, পরিচিত প্রকাশনার নাম এবং বইয়ের গুণগত মানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

খাবারের দোকান আছে কয়েকটি, কিন্তু তাদের মানসম্মত বলা যায় না। গতবারের মেলায় বেশ কিছু ভালো মানের দোকান ছিল। রোজার মাসে বিশেষ আয়োজনের দোকান না থাকাটাই স্বাভাবিক। তবু ইফতারের জন্য ভালো দোকান থাকলে মন্দ হতো না। মসজিদের সুব্যবস্থা থাকার কথা, তবে সরেজমিনে তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কারও কারও মতে, ইফতারের একঘণ্টা পর মেলা হঠাৎ করেই জমে ওঠে, অনেক ক্রেতা আসেন। কিন্তু এই জমজমাট পরিবেশ মাত্র একঘণ্টা স্থায়ী হয়। মানুষের ফেরার তাড়া থাকে, মেট্রোতে ভিড়ের ভয় থাকে, এবং ঢাকার রাস্তায় ছিনতাইয়ের আশঙ্কা কাজ করে।

প্রকাশকদের সতর্কতা ও বইয়ের মান

ভালো কিছু নতুন বই এবারের মেলায় এসেছে। প্রকাশকরা খুবই সতর্ক হয়ে বই প্রকাশ করছেন। তারা অযাচিতভাবে বই ছাপাচ্ছেন না। আমরা যতই উচ্চমার্গের আলোচনা করি না কেন, বই শেষ পর্যন্ত একটি পণ্য এবং তার তুলনামূলক মূল্য বিচার করার দায়িত্ব প্রকাশকেরই। দিনশেষে এর মূল্য তাকেই চোকাতে হয়। তাই তারা অত্যন্ত সাবধানী হয়ে গেছেন। বেশিরভাগ প্রকাশনী হাতে গোনা কয়েকটি বই এনেছেন, খুব সতর্কভাবে বাছাই করে। এর ফলে ক্রেতারা উপকৃত হচ্ছেন, কারণ তাদের সামনে পছন্দের তালিকা ছোট কিন্তু গুণগত মানসম্পন্ন। অনেকগুলো ফিল্টার পেরিয়েই বই বের হচ্ছে। এজন্যই এই মেলায় প্রকাশিত বেশিরভাগ বইয়ের মান ভালো। এই শীতল ও কঠিন ছাঁকনি থাকায় শেষ পর্যন্ত ভালোই হয়েছে।

প্রকাশকদের অংশগ্রহণে সংকট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

এই বইমেলায় অনেক প্রকাশকই অংশ নেননি। মেলায় অংশ নেওয়ার জন্য একটি আর্থিক বিনিয়োগ প্রয়োজন— স্টলের জন্য বিক্রয়কর্মী নিয়োগ, তাদের বেতন ও খাবারের খরচ, স্টলের আনুষঙ্গিক ব্যয় (যদিও ভাড়া মওকুফ করা হয়েছে), বই আনা-নেওয়ার খরচ ইত্যাদি। এই খরচ বহন করতে অনেকেই ইচ্ছুক ছিলেন না। এবং আগামী দুই বছরও আরবি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী রমজান মাস ফেব্রুয়ারির কাছাকাছি সময়ে পড়বে। ফলে বইমেলার এই অধোগতি সম্ভবত আগামী দুই বছরই থাকবে।

যারা পাকা ও অভিজ্ঞ প্রকাশক, যারা দীর্ঘদিন ধরে বইয়ের ব্যবসায় রয়েছেন— কেউ কেউ চার কিংবা সাত দশক ধরে— তারা এই ধরনের সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবেন। এটি ব্যবসায়ের স্বাভাবিক চক্র— কখনও মুনাফা, কখনও লোকসান। দুই-তিন বছরের লোকসান সহ্য করেও বড় প্রকাশকরা টিকে থাকবেন। কিন্তু ক্ষুদ্র পুঁজির ও মৌসুমি প্রকাশকরা মার খাবেন। ফলে, তিন বছর পর অনেক প্রকাশককেই আর বইমেলায় দেখা যাবে না। যাদের পুঁজির জোর থাকবে এবং বইয়ের কন্টেন্ট ভালো থাকবে, তারাই টিকে থাকবেন। এভাবে একটি মেদহীন ও গুণগত বইমেলা পাওয়া যেতে পারে।

এটা রূঢ় শোনাতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— পাঠক যদি কমে যায়, তাহলে এত বেশি প্রকাশনীর ভিড় থাকার কী অর্থ? এখানে মুনাফা নির্দিষ্ট থাকার কথা, তাই ফাটকা পুঁজির কারবার বইমেলায় ঠিক নয়। ফাটকাবাজি মাত্র এক-দুই বছর টিকে থাকে, তার বেশি নয়।

মিডিয়া উপস্থিতি ও সামাজিক প্রভাব

বইমেলাকেন্দ্রিক মিডিয়া উপস্থিতিও এবার কম দেখা যাচ্ছে। অন্যবারে অনেক টেলিভিশন চ্যানেলের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকত, এবার সেটা কম। কিছু ছোট ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক মিডিয়া উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, যারা সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সীমিত পরিসরে খবর পরিবেশন করছেন। ফলে এই বইমেলা বাঙালি মধ্যবিত্তের দৃষ্টি, দৃশ্যমানতা ও মনন থেকে কিছুটা বিচ্যুত হয়েছে বলে মনে হয়। মিডিয়ায় সরব খবরাখবর মানুষের সামনে বইমেলার নানা দিক তুলে ধরে, ফলে বইমেলার একটি সক্রিয় আওয়াজ তৈরি হয়। সেই স্বর এবার অনেকটাই অনুপস্থিত মনে হচ্ছে।