শরণ এহসানের প্রথম নাট্যগ্রন্থ ‘পুরনামা’ প্রকাশ, পেয়েছেন ঐতিহ্য-শান্তনু কায়সার সাহিত্য পুরস্কার
সময়ের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বাস্তবতা, ক্ষমতার পালাবদল এবং গ্রামীণ জনপদের শোষণ-বঞ্চনার চিরায়ত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয়েছে শরণ এহসানের প্রথম নাট্যগ্রন্থ ‘পুরনামা’। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ঐতিহ্য প্রকাশনী, এবং এই উল্লেখযোগ্য পাণ্ডুলিপির জন্য তিনি অর্জন করেছেন ‘ঐতিহ্য-শান্তনু কায়সার সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫’। এই স্বীকৃতি তার সাহিত্যিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গ্রামীণ শোষণের নির্মম বাস্তবতা
বঙ্গীয় ভূমির ইতিহাসে যুগে যুগে নিম্নবিত্ত কৃষক-শ্রমিক শ্রেণি শোষণের শিকার হলেও, ক্ষমতার হাতবদল তাদের ভাগ্যরেখায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারেনি। এই সহজ অথচ আড়ালকৃত সত্যই নাটকটির কেন্দ্রীয় ভাষ্য হিসেবে কাজ করেছে। নাটকের পটভূমি যশোর ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের কোনো একটি গ্রাম ‘দরগাহপুর’কে ঘিরে গড়ে উঠেছে, যার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে প্রাচীন কাকশিয়ালী নদী।
নদীমাতৃক জনজীবনের সরলতার আড়ালে ক্ষমতার জটিল কাঠামো, ধর্মীয় বিভেদের উত্থান এবং সামাজিক বৈষম্যের ধারাবাহিকতা নাট্যঘটনার পরতে পরতে উন্মোচিত হয়েছে। রহমান জোয়ার্দার বা শ্যামল ভট্টাচার্যের মতো চরিত্রদের অবস্থানগত পরিবর্তন সালেক মাঝি, মঞ্জরি, ভুলু কিংবা হরেণ বেহারার জীবনে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে না—এই নির্মম বাস্তবতাই নাটকের অন্তঃসুর হিসেবে প্রস্ফুটিত হয়েছে।
আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির সমন্বয়
নাটকটিতে ঐতিহ্যবাহী পালকির গানের ঢঙে রচিত পদ এবং কাকশিয়ালী নদীর গুড়পুকুর মেলার ঐতিহাসিক নৌকাবাইচকে ঘিরে সারিগানের আঙ্গিকে নির্মিত বাইচের গান সংযোজিত হয়েছে। ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কুষ্টিয়া ও যশোর অঞ্চলের আঞ্চলিক রীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যা পাঠকদের কাছে স্থানীয় সংস্কৃতির একটি জীবন্ত চিত্র উপস্থাপন করে।
নাট্যকার শরণ এহসান তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “বাংলা নাটকের দীর্ঘদিনের যাত্রাপথে মস্ত মহিরুহদের মাঝে আমার এ অর্জন অতি ক্ষুদ্র। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে পড়াকালীন সময়ে এমন স্বীকৃতি যারপরনাই প্রেরণা জোগাবে। এই বঙ্গভূমির পূর্বজগণের সহস্রকালের ইতিহাস বুকে টেনে নিয়ে হেঁটে যেতে চাই। এই বদ্বীপের বুকচিরে বসবাসরত বাঙালিসহ সকল জাতিসত্তার অন্ত্যজ গাঢ়তর আবেগ আমার যাত্রাপথের সঙ্গী হোক, এই পরম চাওয়া। দেশের মা, মাটি ও মানুষের জন্য আমৃত্যু আমার কলম সচেষ্ট থাকবে।”
গ্রন্থের প্রযুক্তিগত বিবরণ
গ্রন্থটির প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে ঐতিহ্য প্রকাশনী। প্রচ্ছদটি ডিজাইন করেছেন নাওয়াজ মারজান, যা নাটকের বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি শৈল্পিক রূপ প্রদান করেছে। বইটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬০ টাকা, এবং এটি স্টল নং ৫৮১–৫৮৬-এ পাওয়া যাচ্ছে। এই নাট্যগ্রন্থটি সাহিত্য অনুরাগী ও গবেষকদের জন্য একটি মূল্যবান সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
