অমর একুশে বইমেলায় নতুন বইয়ের সমারোহ, রাজনীতি ও সেনাবাহিনীর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনামূলক গ্রন্থ
বইমেলায় ভিড় ঠেলতে ঠেলতে ধীর পায়ে স্টলের সামনে দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সেই পুরনো অভ্যাস এবার অনেকটাই অনুপস্থিত। তবে, মেলার পরিবেশ এখনো বেশ মনোরম বলে মনে করছেন অনেক দর্শনার্থী। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্টলে বই কিনতে দেখা গেছে মিরপুর মডেল একাডেমির শিক্ষক বিপুল দাস ও তাঁর দশম শ্রেণির ছেলে সৌমিত্র দাসকে। বিপুল দাস বাংলা একাডেমি থেকে সৈয়দ মকসুদ আলীর প্লেটোর রিপাবলিক কিনেছেন, আর ছেলের জন্য বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে নিয়েছেন পরশুরাম গল্পসমগ্র। তাঁদের মতে, বই কেনার জন্য এবারের মেলার পরিবেশ বেশ ভালো, যদিও ভিড়ের অভাব কিছুটা অনুভূত হচ্ছে।
শিশুপ্রহর ও বিক্রির আশা
আজ শুক্রবার মেলা শুরু হবে শিশুপ্রহর দিয়ে, যা বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলবে। এরপর মেলা টানা রাত নয়টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। বিক্রেতারা আশা করছেন, আজকের দিনে বেচাকেনার মন্দা কেটে যাবে। গত কয়েক দিনে শুধু গল্প-উপন্যাস বা মননশীল প্রবন্ধ নয়, সব ধরনের বইয়ের বিক্রিই কমে গেছে। রমজান মাস চললেও ইসলামি বইয়ের বিক্রিও পড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন প্রকাশকরা।
দারুস সালাম বাংলাদেশের স্টলের ব্যবস্থাপক মুশফিকুল হক গতকাল মাত্র এক হাজার টাকার বই বিক্রির কথা জানিয়েছেন। তাঁদের স্টলে ড. মরিস বুকাইলির বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান এবং শিশুদের জন্য গল্পে গল্পে ছোটদের ৩৬৫ দিন বই দুটি বিক্রি হয়েছে।
নতুন বইয়ের তালিকা
গতকাল মেলার তথ্যকেন্দ্রের হিসাব অনুসারে নতুন বই এসেছে ৯২টি। প্রথমা প্রকাশনের স্টলে নতুন এসেছে মতিউর রহমানের বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী: ১৯৯৬-২০১০ এবং আশানুর রহমানের দুটি নভেলা—প্রথম প্রেম ও ছায়ার আঙিনা। আগে প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে আকবর আলি খানের পুরানো সেই দিনের কথা ও মশিউল আলমের উপন্যাস দ্বিতীয় খুনের কাহিনি ভালো চলছে।
অন্যান্য প্রকাশনা সংস্থার নতুন বইয়ের মধ্যে রয়েছে:
- হরিশংকর জলদাসের উপন্যাস কচদেবযানী (অবসর)
- আবিদ আনোয়ারের কাব্য সন্ন্যাসীরা গাজন থামা (আগামী)
- সারওয়ার-উল-ইসলামের ছড়া অন্ধকারের বৃষ্টি (নালন্দা)
- পিয়াস মজিদের নির্বাচিত কবিতা (পাঞ্জেরী)
- পল্লব মোহাইমেনের তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক গ্রন্থ প্রযুক্তির এই দিনে (প্রতিভাষা প্রকাশন)
- ফরিদুর রেজা সাগরের 'ছোটকাকু' সিরিজের মেহেরপুরের মোহর (অনন্যা)
- মোরশেদ শফিউল হাসানের জীবনীবিষয়ক গ্রন্থ মহাজীবনের কথা (অনুপম)
- শারমিন আহমদ ও সোহেল তাজের স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ শতাব্দীর কণ্ঠস্বর তাজউদ্দীন আহমদ: কন্যার চোখে পুত্রের চোখে (ঐতিহ্য)
- সৈয়দ শাহরিয়ার রহমানের ভাষাবিষয়ক গবেষণা পরাভাষা প্রকরণ কথনবিশ্ব (ইউপিএল)
- আশরাফুল ইসলামের ভ্রমণ গদ্য ভদ্রাবতীর পাড়ে (স্বপ্ন-৭১ প্রকাশন)
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে গ্রন্থ
মতিউর রহমানের বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী: ১৯৯৬-২০১০ বইটি নিয়ে পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা প্রায়ই সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়, এবং প্রকাশ্যে এ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না। তবে, মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে কৌতূহল সব সময়ই থাকে। দেশের ইতিহাসে সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে, এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এই সম্পর্ক নতুন এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।
এই বইটিতে ১৯৯৬ থেকে ২০১০ সালের কালপর্বে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা এবং তার সঙ্গে দেশের রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে গভীর আলোচনা করা হয়েছে। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মিশেলে তৈরি এসব লেখা সংবাদপত্রে প্রকাশকালেই অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। বইটি পাঠকদের জন্য রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা আলোচনার পথনির্দেশ করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
মেলায় বইটি প্রথমা প্রকাশন নিয়ে এসেছে, এবং এটি ইতিমধ্যেই পাঠকদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের রাজনীতিতে কতটুকু সম্পৃক্ত হতে পারে, এবং এ সম্পর্কে আমাদের করণীয় কী—এসব প্রশ্নের মীমাংসা এই বইয়ের মাধ্যমে কিছুটা হলেও সম্ভব হতে পারে।
