বইমেলায় অনুবাদ বই প্রকাশে প্রকাশকের অনীহা: ওয়াহিদ কায়সারের উদ্বেগ
অনুবাদক ওয়াহিদ কায়সার এবারের একুশে বইমেলায় একটি অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের অনুবাদ সম্পন্ন করলেও প্রকাশকরা সেগুলো প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। কায়সার বলেছেন, "বড় একটি প্রকাশনা বই তিনটির পাণ্ডুলিপি গ্রহণ করলেও এই বইমেলায় বইগুলো আনতে অপারগতা জানিয়েছে। তারা সম্ভবত এই বইমেলার বইয়ের বিক্রি ও সাফল্য নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী না। এজন্য কোনো ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না।"
অনুবাদকৃত বইগুলোর বিষয়বস্তু ও গুরুত্ব
কায়সারের অনুবাদকৃত বই তিনটি হলো:
- সিজার আইরার 'আমি যেভাবে একজন নান হয়েছিলাম'
- রিশার্ত কাপুসচিন্সকির 'জীবনের আরেকটা দিন'
- লিওনোরা ক্যারিংটন গল্পসমগ্র
তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, কাপুসচিন্সকির সাহিত্যকর্ম ম্যাজিক জার্নালিজম ধারার প্রতিনিধিত্ব করে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে গভীরভাবে উপস্থাপন করে। অন্যদিকে লিওনোরা ক্যারিংটনের গল্পগুলো বড়দের জন্য লেখা রূপকথা, যেখানে যৌনতা ও ভায়োলেন্সের উপস্থিতি রয়েছে।
বাংলা একাডেমির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বইমেলা আয়োজনে বাংলা একাডেমির ভূমিকা নিয়ে কায়সার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, "আমার মনে হয়েছে এবারের বইমেলা নিয়ে বাংলা একাডেমির উৎকণ্ঠা ছিল। এরকম একটা প্রতিষ্ঠানের আসলে উৎকণ্ঠা থাকার কথা না। মানুষ পলিটিক্যাল, প্রতিষ্ঠান তো না। তাদের আরও বেশি বলিষ্ঠ হওয়া দরকার ছিল।"
সময়সীমা ও রমজানের প্রভাব
এবারের বইমেলা সময়সীমা কমে যাওয়া এবং রমজান মাসের সাথে সমাপতিত হওয়ার প্রভাব নিয়ে কায়সার বলেছেন, মধ্যবিত্ত পাঠকরা সাধারণত জানুয়ারি পর্যন্ত টাকা জমিয়ে রাখেন বইমেলার জন্য। কিন্তু এবার ঈদের কেনাকাটা ও বইমেলা সামনাসামনি পড়ায় সিরিয়াস পাঠকরাও হয়তো পোশাক-আশাকের পেছনে বেশি খরচ করবেন, যা বই ক্রয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রকাশনা শিল্পের গভীর সংকট
ওয়াহিদ কায়সার প্রকাশনা শিল্পের কয়েকটি মৌলিক সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন:
- একুশে বইমেলার ওপর অতিনির্ভরতা: তিনি বলেন, "একুশে বইমেলার ওপর অতি নির্ভরতা আসলে আমাদের প্রকাশনা শিল্পের জন্য ভালো না। কোনো কারণে এক বছর বইমেলা না হলে অনেক ছোট প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।"
- ডিজিটাল ডেটাবেইজের অভাব: কায়সার জোর দিয়ে বলেন, অনুবাদের স্বার্থে একটি ডিজিটাল ডেটাবেইজ তৈরি করা জরুরি। এর অভাবে একই বইয়ের অনেক বাংলা অনুবাদ হচ্ছে, অথচ ইয়ান ম্যাকইউয়ান, ডন ডিলিলো, করম্যাক ম্যাকার্থি বা ফিলিপ রথের মতো গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের বই বাংলায় অনূদিত হয়নি।
- সম্পাদনার মান: তিনি উল্লেখ করেন, "সম্পাদনা এখনো এদেশে পেশা হয়ে ওঠেনি। তাই ভালো সম্পাদক পাওয়া কঠিন।" বইমেলার আগে জানুয়ারি মাসে পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার কাজ দ্রুত করতে হয়, যা মান নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করে।
পাঠক-লেখক সম্পর্ক ও বিপণনের সংকট
কায়সার পাঠক ও লেখকের মধ্যে দূরত্বের বিষয়ে বলেছেন, "ভালো লেখক ভালো পাঠক তৈরি করেন। তবে ভালো লেখক আবার বিস্মৃত হয়ে পড়েন ভালো পাঠকের অভাবে।" তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে বই লেখায় যতটা জোর দেওয়া হয়, বিপণনে সেটা করা হয় না, যা পাঠক ও লেখকের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।
নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বইমেলায় নিরাপত্তা নিয়ে কায়সার বলেন, আশঙ্কা প্রতিবারই কম-বেশি থাকে, তবে এখন পর্যন্ত মেলা বন্ধ করতে হয়নি এমন ঘটনা ঘটেনি। তিনি পরামর্শ দেন, বইমেলা আয়োজনে সারা বছর ধরে পরিকল্পনা করা উচিত, যাতে এটি শুধুমাত্র বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ের ইভেন্ট না হয়ে উঠে।
ওয়াহিদ কায়সারের এই সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের গভীর সংকট, অনুবাদ সাহিত্যের অবস্থান এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। বইমেলা কেবলমাত্র বই বিক্রির মেলা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যার সফল আয়োজন সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
