বাংলা ভাষায় কুৎসিত শব্দ প্রবেশের আশঙ্কা, একুশের চেতনা পুনরুদ্ধারে ঐক্যের আহ্বান
বাংলা ভাষায় কুৎসিত শব্দ প্রবেশ, একুশের চেতনা পুনরুদ্ধারে আহ্বান

বাংলা ভাষায় কুৎসিত শব্দের প্রবেশ ও একুশের চেতনার সংকট নিয়ে উদ্বেগ

মহান একুশের ভাষাশহীদদের স্মরণে আয়োজিত ‘চেতনায় একুশ’ শীর্ষক আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনেরা বাংলা ভাষায় সম্প্রতি কুৎসিত শব্দের প্রবেশ এবং একুশের চেতনা থেকে জাতির পিছিয়ে পড়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, বাংলা ভাষা এবং অভিধানে যদি এসব অশ্লীল ও বিপরীত লিঙ্গের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যবহার সংক্রান্ত শব্দ যুক্ত হয়ে যায়, তবে ভাষার মাধুর্য বিলুপ্তির ঝুঁকি তৈরি হবে।

ভাষার মাধুর্য রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপের তাগিদ

আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনে অবস্থিত শহীদ মুনির-আজাদ সভাকক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মণি সিংহ–ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্ট। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতিবাদের ভাষা সুশীল ও মার্জিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে বাংলা ভাষায় বেশ কিছু কুৎসিত শব্দ যোগ হয়েছে, যা ভাষার সৌন্দর্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।

সারওয়ার আলী আরও বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন যে চেতনাকে ধারণ করে সংগঠিত হয়েছিল, বর্তমানে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে তার বিপরীত ধারণার ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে এই বিপরীত চেতনার প্রভাব আমাকে ব্যাপকভাবে বিস্মিত করে।’ তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ভাষা আন্দোলন দেশের জাতীয় চেতনাকে উন্মোচিত করেছিল এবং একুশের চেতনা পরবর্তীতে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল।

একুশের চেতনা পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টার আহ্বান

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মণি সিংহ–ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্টের সভাপতি শেখর দত্ত। তিনি কবি শামসুর রাহমানের ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন এবং ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। শেখর দত্ত বলেন, ‘একুশ মানে মাথা নত না করা। জাতীয় জীবনে একুশের চেতনা সবচেয়ে বড় অধ্যায়, যেখানে পুরো জাতি মাতৃভাষা, জন্মভূমি ও বর্ণমালার জন্য একত্রিত হয়।’

রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ জাতি হিসেবে সংস্কৃতি ও রুচিবোধ থেকে সরে যাওয়ার প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘যদি সরে যেতে থাকে, তাহলে প্রত্যেকের সাধ্যমতো প্রচেষ্টার মাধ্যমে একুশের জন্য কিছু করা সম্ভব। নাহলে বছরে একবার দিবস স্মরণ করে বেশি লাভ হবে না।’ তিনি মনে করেন, একুশ এখনো জাতীয় রাজনীতিতে মূল শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে, যার প্রমাণ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য।

সাম্প্রদায়িক শক্তির মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আমিনুল হক সাম্প্রদায়িক শক্তির কাজকে অনেক পরিকল্পিত বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘এই সংকট মোকাবিলা করতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে একুশের চেতনাকে শক্তভাবে উপস্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি।’ তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, নতুন প্রজন্মের মাধ্যমেই একুশের চেতনা ফিরে আসবে এবং তারাই আগামীর নেতা, শিক্ষক ও কবি হিসেবে ভূমিকা রাখবেন।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন কবি ও লেখক নীনা হাসেল এবং সমাজ বিকাশ পাঠাগারের সভাপতি নিতাই কান্তি দাস প্রমুখ। এই আলোচনা বাংলা ভাষার মাধুর্য রক্ষা এবং একুশের চেতনা পুনরুদ্ধারে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্বকে আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।