বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার নিয়ে নতুন বিতর্ক: মোহন রায়হানকে আমন্ত্রণ জানিয়েও পুরস্কার দেওয়া হয়নি
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (কবিতা) প্রদানের জন্য কবি মোহন রায়হানকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। এই ঘটনায় দেশের সাহিত্য ও শিল্প অঙ্গনসহ বিদগ্ধ মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একটি স্বশাসিত সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলা একাডেমির ভূমিকা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।
পুরস্কার বিতর্কের ইতিহাস: এবারই প্রথম নয়
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার নিয়ে এবারই প্রথম বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি। গত বছরও ২০২৪ সালের পুরস্কার ঘোষণাকে ঘিরে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় মুক্তিযুদ্ধ বিভাগে মোহাম্মদ হাননান এবং শিশুসাহিত্যে ফারুক নওয়াজের নাম ঘোষণা করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। এ পুরস্কার নিয়ে নানামুখী বিতর্কের প্রতিবাদে কথাসাহিত্য বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত সেলিম মোরশেদ নিজের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারকে ঘিরে এমন কর্মকাণ্ডে বীতশ্রদ্ধ হয়ে এর আগেও নির্বাহী পরিষদের একজন এবং পুরস্কার কমিটির একজন সদস্য পদত্যাগ করেছিলেন। তবু পুরস্কারপ্রক্রিয়া নিয়ে একাডেমির বিতর্ক থামেনি। কবি মোহন রায়হানের ক্ষেত্রে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি সেই বাস্তবতাই আবারও সামনে এনেছে।
মন্ত্রী ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: অভিযোগ তদন্ত চলছে
ঘোষণা করা সত্ত্বেও কবি মোহন রায়হানকে কেন পুরস্কার দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেছেন, ‘মোহন রায়হানের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ আছে। এসব বিষয় খতিয়ে দেখে আবার পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। আগের সরকারের সময় বাংলা একাডেমি তাঁকে এ পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছিল। এখন আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব। তারপর সিদ্ধান্ত হবে।’
কোন ধরনের অভিযোগ মোহন রায়হানের বিরুদ্ধে ছিল, এ প্রশ্নের জবাবে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, ‘এটা নিয়ে এখন কথা বলা যাবে না। বিষয়টি যেহেতু খতিয়ে দেখা হচ্ছে, তাই এ বিষয়ে বলা যাবে না।’
পুরস্কার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, এ প্রশ্নে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘এখনো এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সিদ্ধান্ত হলে জানানো হবে। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয় কাজ করছে।’
মোহন রায়হানের প্রতিক্রিয়া: ‘অমানবিক আচরণ’
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বা বাংলা একাডেমি কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা নিয়ে কবি মোহন রায়হান ভাবছেন না। তিনি বলেন, ‘এই পুরস্কার নেওয়ার আর প্রশ্নই আসে না। আমার সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা অমানবিক। আমি পুরস্কার চাইনি। একাডেমি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আমাকে মনোনীত করে দাপ্তরিক চিঠি দিয়েছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই আনন্দিত হয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বাংলা একাডেমিতে গেলে প্রথমে মহাপরিচালক জানান, “একটি দুঃসংবাদ আছে। বিশেষ কারণে আপনাকে এখন পুরস্কার দেওয়া যাচ্ছে না। আপনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকলে ভালো হবে”। পরে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মও বলেন, আমার উপস্থিতি প্রধানমন্ত্রীর জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু আমি তাঁদের জানাই, আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমি অনুষ্ঠানে থাকতে চাই এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকি।’
মোহন রায়হান বলেন, ‘পুরস্কার প্রদান পর্ব শেষ হলে আমি অনুষ্ঠানস্থল থেকে চলে আসি। আমি বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে জাতির কাছে তুলে ধরার জন্য সংবাদ সম্মেলন করার পরিকল্পনা করেছি। হয়তো রোববার সংবাদ সম্মেলন করে জানাব নেপথ্যে কী ঘটনা ঘটেছিল।’
বিতর্কের দীর্ঘ ইতিহাস: জসীমউদ্দীন থেকে বর্তমান
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তিত হয় ১৯৬০ সালে। তবে স্বাধীনতার পরপরই এ পুরস্কারকে ঘিরে বিতর্কের সূচনা ঘটে। স্বাধীনতার পর কবি জসীমউদ্দীনকে পুরস্কার দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি জানতে পেরে কবি তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের কাছে জানান, তাঁকে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে তিনি তা গ্রহণ করতে পারবেন না। বহু কনিষ্ঠ কবি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়ে যাওয়াই ছিল তাঁর আপত্তির কারণ।
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের প্রথম ঘটনা ঘটে ১৯৭২ সালে। বামপন্থী গবেষক ও জনবুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর প্রবন্ধ সাহিত্যে পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও নীতিগত কারণে তা গ্রহণ করতে অসম্মত হন। এরপর ১৯৮২ সালে নাট্যকার মামুনুর রশীদ নাটকে বাংলা একাডেমি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও স্বৈরাচারী এইচ এম এরশাদের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণে অসম্মতি জানিয়ে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
২০১৭ সালে অনুবাদ সাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক নিয়াজ জামানকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। নিয়াজ জামান ১৯৭৫ সালে ডেইলি অবজারভার পত্রিকায় শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। এ জন্য তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিব্রত হতে পারেন বলে মন্ত্রণালয় থেকে একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানকে জানানো হয়েছিল।
২০২৪ সালে গল্পকার জাকির তালুকদার ২০১৪ সালে পাওয়া তাঁর পুরস্কারটি বাংলা একাডেমিতে ফেরত দেন। তিনি তখন বলেছিলেন, বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিয়ে যেসব বিতর্ক ও দলীয় বিবেচনা কাজ করছে, তাতে এই পুরস্কার তাঁর কাছে মর্যাদাকর নয়।
পুরস্কার প্রক্রিয়া ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন
একাডেমির পুরস্কারের নীতিমালা অনুসারে, একাডেমির নির্বাহী পরিষদ ৩০ জন ফেলোকে নিয়ে একটি প্রস্তাবক কমিটি গঠন করে। তাঁরা পুরস্কারের জন্য প্রতিবছর ১৫ জানুয়ারির মধ্যে নাম প্রস্তাব করে মহাপরিচালকের কাছে পাঠান। মহাপরিচালক সাত সদস্যের পুরস্কার কমিটি গঠন করেন। এ কমিটি ফেলোদের প্রস্তাব থেকে নাম চূড়ান্ত করে। চূড়ান্ত নাম একাডেমির নির্বাহী কমিটির কাছে পাঠানো হয়। নির্বাহী কমিটি পুরস্কার কমিটির কোনো নাম ‘যৌক্তিক কারণে’ বিবেচনা না করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করে। তবে তারা নতুন কোনো নাম যুক্ত করতে পারে না।
বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ বলেন, বাংলা একডেমির নীতিমালাতেই স্পষ্ট বলা আছে, শুধু নির্বাহী কমিটিরই পুরস্কার কমিটির কোনো নামের বিষয়ে আপত্তি জানানোর অধিকার রয়েছে। তবে তারা নতুন নাম যুক্ত করতে পারবে না। আর আপত্তি না থাকলে নাম চূড়ান্ত হবে। সেই নাম মন্ত্রণালয় বা অন্য কারও পরিবর্তন করার নীতিগত সুযোগ নেই। এটা করা হলে তা হবে বেআইনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলা একাডেমির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, গত প্রায় দুই দশক থেকে যেভাবে একাডেমির ওপর মন্ত্রণালয় তার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছে, তাতে এখানে স্বায়ত্তশাসন বলে কিছু নেই। এসব সিদ্ধান্তের ফলে একাডেমি জনসাধারণের কাছে সমালোচিত ও অনেক সময় নিন্দিত হয়েছে, যা ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানের জন্য অমর্যাদাকর।
অন্যান্য পুরস্কার ও বিশেষজ্ঞ মতামত
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও আরও কিছু পুরস্কার প্রদান করে। একাডেমি পরিচালিত এসব পুরস্কার নিয়েও অতীতে বিতর্ক ও প্রত্যাখ্যানের দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিশিষ্ট লেখক ও চিন্তক আহমদ ছফাকে ১৯৯৩ সালে বাংলা একাডেমি পরিচালিত ‘সাদত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার’ দেওয়া হয়েছিল। পুরস্কারটি তিনি ফিরিয়ে দেন। এ ছাড়া ২০১৯ সালে ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সাহিত্য পুরস্কার’ দেওয়া হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী কবি ওমর শামসকে। ‘প্রবাসী সাহিত্যিক’ হিসেবে পুরস্কার দেওয়ার জন্য তিনি নেননি।
বাংলা একাডেমির পুরস্কার-বিতর্ক সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নাট্য সংগঠক সামিনা লুৎফা বলেন, বাংলা একাডেমির নিজস্ব ধরনের স্বশাসন আছে। সে অনুসারে তারা পুরস্কারের জন্য তাদের নিয়মে নাম প্রস্তাব করে। সরকারের উচিত একাডেমির এই সিদ্ধান্তকে সম্মান করা। এ বিষয়ে একাডেমির ওপর সরকারের চাপ দেওয়া উচিত নয়।
সামিনা লুৎফা আরও বলেন, একজন কবি কী লিখবেন না লিখবেন, সেটা তাঁর বিষয়। এটা নির্ধারণ করা সরকারের কাজ নয়। শিল্পী-সাহিত্যিকেরা প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে কাজ করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। তাঁদের কাজের স্বাধীনতা দরকার বলে তিনি মনে করেন। এসব বিষয়ে বাংলা একাডেমির ওপর সরকার কোনো চাপ দেবে না এবং কবি মোহন রায়হানের পুরস্কার তাঁকে সসম্মানে ক্ষমা চেয়ে ফেরত দেওয়া হবে—এটাই তাঁর প্রত্যাশা।
