দূর প্রবাসে শীতের অভিজ্ঞতা: বরফের দেশে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর অনুভূতি
যুক্তরাষ্ট্রে তুষারে ঢেকে গেছে রাস্তাঘাট, আর বাংলাদেশে এখন বেশ গরম। এই বৈপরীত্যের মাঝে দাঁড়িয়ে একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর গল্প, যিনি হাজার মাইল দূরে মার্কিন মুলুকে বসবাস করছেন। গত আগস্ট থেকে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের পূর্ব উপকূলে অবস্থান করছেন তিনি, যেখানে নামে বসন্ত চললেও প্রকৃতির রূপ ভিন্ন।
শৈশবের শীত থেকে বিদেশের প্রথম শীত
মফস্বলি শৈশব-কৈশোরে প্রবাদের সেই মাঘের শীতের স্মৃতি এখনো গায়ে লেগে আছে। উত্তরের হাওয়া, ফরিদপুরের ছোট্ট টিনের বাড়ি, বাবার খদ্দরের চাদর আর মায়ের ভুসির চুলা—সবই মনে পড়ে যায়। কিন্তু যখন ইলিনয়ের একটি কলেজ টাউনে পৌঁছান, তখন শুনতে পান, "বাছা, এলে তো বটে, শীতটা কাটলে হয়!" প্রবাসে প্রথম শীতের উত্তেজনা আর ভয় মিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করে।
বরফ পড়ার অপেক্ষা ও অভিজ্ঞতা
শরৎ শেষ হয়ে গাছেরা সবুজ থেকে রঙিন, তারপর ন্যাড়া হয়ে শীতের আগমন জানান দেয়। হাতমোজা, জ্যাকেট, কানটুপি বেরিয়ে আসে লাগেজ থেকে। একদিন পূর্বাভাস এল—বরফ পড়বে! ভারি দস্তানা আর উপযুক্ত জুতা পরে ল্যাবের দিকে রওনা দিলেন। ড্রাইভওয়েতে লবণ ছড়ানো দেখে বোঝা গেল, বরফ মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু।
নির্ধারিত সময়েই বরফ পড়া শুরু হলো। পেঁজা তুলোর মতো বরফ ভেসে এসে গায়ে পড়ে, পড়েই জল হয়ে যাচ্ছে—ঠিক যেন গরম ফ্রাইং প্যানে মাখনের টুকরো। বরফ পড়া নিয়মিত দৃশ্যে পরিণত হয়, কখনো তুষারঝড়ে রূপ নেয়। এমন দিনে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যেত, বাইরে ঝড় আর ভেতরে দেশীয় খাবারের আড্ডা জমে উঠত।
বরফের খেলা থেকে বিষণ্ণতার দিন
ঢালু জমিতে জমে উঠত স্লাইডিংয়ের প্রতিযোগিতা। প্লাস্টিকের ঢাকনা থেকে ট্রাফিক সাইনবোর্ড—যা আছে তাই নিয়ে সবাই হাজির হতো বরফের মধ্য দিয়ে গড়িয়ে পড়ার খেলায়। কিন্তু মাস্টার্স শেষ করে জর্জিয়ার আটলান্টায় পিএইচডি করতে এসে বরফের জায়গা নিয়েছে বৃষ্টি আর জোলো বাতাস।
একটানা বরফ বা বৃষ্টি মনের ভেতর বিষণ্ণতা তৈরি করে, বিশেষত যখন কাজকর্ম থেমে থাকে না। সকালে উঠে বাইরে কয়েক ইঞ্চি পুরু বরফ, মন চায় ধোঁয়া ওঠা কফি আর আটপৌরে সময়, কিন্তু তা সম্ভব হয় না। ক্লাস, ল্যাব, গবেষণা—সব মিলিয়ে হতাশা জর্জরিত শরীর নিয়ে ঘরে ফেরা।
গবেষণার চাপ ও একাকীত্ব
সেমিস্টার ব্রেকে কনফারেন্সের জন্য প্রফেসরের সঙ্গে দীর্ঘ মিটিং, লেখা নিয়ে কাটাছেঁড়া। থিওরেটিক্যাল কোর্সের অ্যাসাইনমেন্ট, টার্ম প্রজেক্ট, মিডটার্ম, ফাইনাল—সব মিলিয়ে ডিপ্রেশন অক্টোপাসের মতো চেপে ধরে। ফাইনাল শেষে ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রীর চাপ কমে, আন্ডারগ্র্যাড ছাত্ররা চলে যায় শীতনিদ্রায়।
গ্র্যাজুয়েট লেভেলের ছাত্রছাত্রীরা গবেষণা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। জনশূন্য ক্যাম্পাসের সুনসান ব্লকে একা থাকার সময় প্রিয় গান বাজে, শৈশবের দৃশ্য ভেসে আসে, দেশে ফেলে আসা আপনজনের মুখ মনে পড়ে। চোখের কোণে জল আসে, কিন্তু ভুলে যেতে হয় বিদেশের ঠান্ডায় হৃদয়ের হিমঘরের দুঃখ।
শীতের রাতে হেঁটে ফেরা
মাস্টার্স চলাকালীন অনেক শীতের রাতে ক্যাম্পাস থেকে হেঁটে বাসায় ফেরার অভিজ্ঞতা হয়েছে। শূন্যের নিচে তাপমাত্রায় বাসায় ফেরার পথ যেন শেষ হতে চায় না, নিজেকে মনে হয় সাদা বরফের মরুভূমিতে দিগ্ভ্রান্ত পথিক। শৈশবে শীতের ছুটি ফুরিয়ে যেত দ্রুত, এখন শীতের লম্বা ছুটিতে কাজ আর ফাঁকা ক্যাম্পাস জাপটে ধরে।
ছুটির ওপারে পরের সেমিস্টার আছে জানি, তবু মানুষের কলরোলে জমাট বাঁধা ডিপ্রেশন যদি সরে যায়, ক্ষতি কী! দূর প্রবাসে জীবনের এই গল্প শুধু একজন শিক্ষার্থীর নয়, অনেকেরই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।



