ইরানের প্রেসিডেন্টের দুঃখ প্রকাশে বিশ্লেষকরা বিস্মিত, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ
যুদ্ধ চলাকালে আরব বিশ্বের প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের দুঃখ প্রকাশের ঘটনা বিশ্লেষকদের অনেককেই অবাক করেছে। ইরানের অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের অংশ হিসেবে গতকাল শনিবার সকালে দেওয়া এক ভাষণে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে হামলার ঘটনায় সরাসরি দুঃখ প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন দুঃখ প্রকাশের ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না, বিশেষ করে যুদ্ধ চলার সময়। এমন পরিস্থিতিতে নেতারা সাধারণত হয় ‘অনুশোচনা’ প্রকাশ করেন কিংবা ‘দায়িত্ব নেওয়া’ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখেন। সেই দিক থেকে ইরানের প্রেসিডেন্ট ব্যতিক্রমী কাজ করেছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভাষণে প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি শান্তির বার্তা
ভাষণে মাসুদ পেজেশকিয়ান মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে হামলার ঘটনায় সরাসরি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের বাহিনীকে প্রতিবেশী দেশগুলোয় হামলা না করতে বলে দেওয়া হয়েছে। তিনি এ–ও বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এসব দেশ থেকে ইরান আক্রান্ত না হলে পাল্টা হামলা চালাবে না তেহরান। ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি মনে করি, যেসব প্রতিবেশী দেশ হামলার শিকার হয়েছে, তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা দরকার। প্রতিবেশী দেশগুলোয় আক্রমণ চালানোর কোনো ইচ্ছা ইরানের নেই।’
দুঃখ প্রকাশের পেছনে সম্ভাব্য কারণসমূহ
এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের প্রেসিডেন্টের এই দুঃখ প্রকাশ কি আসলেই আন্তরিক? তিনি এখন কেন এভাবে দুঃখ প্রকাশ করলেন? বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের বিস্তৃতি চায় না এর একটা কারণ হতে পারে। ইরানের অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব ক্রমেই বাড়তে থাকা আঞ্চলিক বিপর্যয়ের লাগাম টেনে ধরার চেষ্টায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায়। পাল্টা জবাব দেয় তেহরানও। ইসরায়েলে পাল্টা হামলার পাশাপাশি ইরানের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনায় আক্রমণ চালানো হয়। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে হামলা–পাল্টাহামলা ছড়িয়ে পড়ে।
মাসুদ পেজেশকিয়ানের মতে, ইরানের ওপর হামলার প্রাথমিক পর্যায়ে দেশটির জ্যেষ্ঠ কমান্ডারেরা নিহত হলে এবং কেন্দ্রীয় কমান্ড কাঠামো বাধাগ্রস্ত হলে যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতিতে প্রতিবেশী দেশগুলোয় হামলা চালানো হয়েছিল। এখন দুঃখ প্রকাশের মধ্য দিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট হয়তো ইঙ্গিত দিতে চাইছেন, তেহরান এ যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ দিতে চায় না।
রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
মাসুদ পেজেশকিয়ানের এভাবে দুঃখ প্রকাশের মধ্যে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে। ইরানের প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ইরান এসব ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এখন প্রতিবেশী দেশগুলো যদি তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানে হামলা অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুমতি দেয় আর এ জন্য ইরানও এসব দেশের ভূখণ্ডে হামলা অব্যাহত রাখে—তাহলে ইরান নিজেকে আরও বিচ্ছিন্ন করার ঝুঁকিতে পড়বে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এই দুঃখ প্রকাশের বিষয়টিকে যুদ্ধনীতিতে রূপান্তর করা হবে কি না, সেটা স্পষ্ট নয়।
কেননা প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের সামরিক বাহিনী কিংবা এ–সম্পর্কিত হামলা এখনো বন্ধ হয়নি। শনিবার বিকেলে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা তাদের লক্ষ্য করে উড়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। যদি এমন হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে যুদ্ধকালে ইরানের অন্তর্বর্তী শাসনকাঠামোর কর্তৃত্ব নিয়ে আরও গুরুতর প্রশ্ন সামনে চলে আসতে পারে। হামলার শুরুর দিকেই ইরানের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অনেকেই নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি রয়েছেন। তাঁর শাহাদাতবরণের পর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার একটি অন্তর্বর্তী কাউন্সিল পেয়েছে। মাসুদ পেজেশকিয়ান নিজেও এ কাউন্সিলের সদস্য।
অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
তত্ত্বগতভাবে এই ক্ষমতাকাঠামো পেজেশকিয়ানের মতো ব্যক্তিদের একটি একক সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের আধিপত্যের অধীনে আগের তুলনায় আরও বেশি প্রভাবশালী করে তুলবে। বাস্তবতা হলো, রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) মতো শক্তিশালী সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে। এখন যদি প্রেসিডেন্টের দুঃখ প্রকাশের পরও প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরান-সম্পর্কিত হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে সেটা যোগাযোগপ্রক্রিয়া ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত দেবে। নয়তো সংঘর্ষ কমাতে অনিচ্ছুক পক্ষগুলোর প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার সপক্ষে ইঙ্গিত দেবে।
কেননা কট্টর যুদ্ধবাজ পক্ষগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ হলো—আঞ্চলিক চাপ। এ ছাড়া ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়াতেও সেই উত্তেজনার প্রতিফলন দেখা গেছে। কট্টরপন্থীদের অনেকেই এরই মধ্যে মাসুদ পেজেশকিয়ানের দুঃখ প্রকাশকে ‘দুর্বল অবস্থান’ বলে সমালোচনা করছেন। এই সমালোচনা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকেও তুলে ধরছে, যা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশটির নেতৃত্বের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে।
