শিশুদের হাম: একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ যা শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই রোগের ভাইরাস দেহে প্রবেশের প্রায় এক থেকে দুই সপ্তাহ পর লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে শুরু করে। প্রাথমিকভাবে, তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে কানের পেছনে, গলার পাশে এবং চুলের গোড়া ধরে লাল র্যাশ দেখা দেয়। এ সময় জ্বর ১০৪ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। র্যাশ প্রথম ২৪ ঘণ্টায় পিঠ, পেট ও ঊরুতে এবং দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে পায়ের পাতায় স্থায়ী হয়।
হামের জটিল উপসর্গ চেনার উপায়
শিশুর হাম নিশ্চিত হওয়ার পর কিছু নির্দিষ্ট উপসর্গ দেখা দিলে বুঝতে হবে পরিস্থিতি জটিল হতে চলেছে। এই উপসর্গগুলির মধ্যে রয়েছে:
- শিশু বুকের দুধ বা পানি পান করতে অক্ষম হওয়া
- খাওয়া সমস্ত খাবার বমি করে দেওয়া
- খিঁচুনি বা জ্বরের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়া
এই লক্ষণগুলি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
হামে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা ও সঠিক পরিচর্যা
হামে আক্রান্ত শিশুর পরিচর্যার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ অনুসরণ করতে হবে। প্রথমত, শিশুকে নিয়মিত বুকের দুধ ও স্বাভাবিক খাবার খাওয়ানো চালিয়ে যেতে হবে। যদি নিউমোনিয়া দেখা দেয়, তবে চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান করতে হবে। অন্যান্য জটিলতা যেমন কান পাকা, রক্ত আমাশয়, দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া বা ক্রুপ হলে সেগুলির যথাযথ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
জ্বর ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের উপরে উঠলে প্যারাসিটামল দেওয়া যেতে পারে। তবে জ্বর যদি তিন থেকে চার দিনের বেশি স্থায়ী হয়, তবে অন্য কোনো সংক্রমণ আছে কিনা তা নির্ণয় করা আবশ্যক।
চোখ ও মুখের যত্নের বিশেষ নির্দেশনা
ভিটামিন এ-র অভাব বা ক্ষতিকর ওষুধের প্রভাবে চোখের কনজাংকটিভাইটিস, কর্নিয়া বা রেটিনার ক্ষতি হতে পারে। চোখ থেকে পরিষ্কার পানি বের হলে সাধারণত চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। কিন্তু চোখে পুঁজ দেখা দিলে জীবাণুমুক্ত তুলা বা পরিষ্কার কাপড় ফুটানো পানিতে ভিজিয়ে চোখ পরিষ্কার করতে হবে। চোখে সাত দিনের জন্য প্রতিদিন তিনবার টেট্রাসাইক্লিন আই অয়েন্টমেন্ট প্রয়োগ করা যেতে পারে। এছাড়াও, চোখে জীবাণু প্রতিরোধকারী প্যাড ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
মুখে ঘা হলে শিশু খেতে বা পানি পান করতে অসুবিধা বোধ করতে পারে। এই ক্ষেত্রে পরিষ্কার লবণ দ্রবণ দিয়ে দিনে অন্তত চারবার মুখের ভেতর পরিষ্কার করা উচিত। এক কাপ ফুটানো পানিতে এক চিমটি লবণ মিশিয়ে এই দ্রবণ তৈরি করা যায়। মুখের ঘা প্রবল বা দুর্গন্ধযুক্ত হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া প্রয়োজন।
হামের টিকা ও ভিটামিন এ-র অপরিহার্য ভূমিকা
হামে আক্রান্ত শিশুকে র্যাশ ওঠার সময় থেকে অন্তত চার দিন অন্য শিশুর সংস্পর্শে আসতে দেওয়া উচিত নয়। হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ডে রাখা উত্তম। ভর্তিকৃত হাম রোগীর সংস্পর্শে আসা ছয় মাসের বেশি বয়সী প্রতিটি শিশুকে হামের টিকা দেওয়া থাকতে হবে। ইতিমধ্যে টিকা পেয়েছে এমন ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশু সংস্পর্শে এলে আরেক ডোজ হামের টিকা প্রদান করতে হবে।
ভিটামিন এ-র অভাব পূরণের জন্য এক মাসের মধ্যে দুই ডোজ ভিটামিন এ দেওয়া প্রয়োজন। প্রথম ডোজ তৎক্ষণাৎ এবং দ্বিতীয় ডোজ দ্বিতীয় দিনে দিতে হবে। শিশুর চোখে ভিটামিন এ-র অভাবজনিত লক্ষণ থাকলে বা মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগলে দু-চার সপ্তাহ পর তৃতীয় ডোজ দেওয়া যেতে পারে। বয়স অনুযায়ী ডোজ নির্ধারণ করা হয়: ছয় মাসের কম বয়সী শিশুর জন্য ৫০ হাজার আইইউ, ৬-১১ মাস বয়সীদের জন্য ১ লাখ আইইউ এবং ১২ মাস থেকে ৫ বছর বয়সীদের জন্য ২ লাখ আইইউ। পরিস্থিতি জটিল হলে শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ: অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।



