হাম আক্রান্ত সাত মাস বয়সী ময়মুনার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে লক্ষ্মীপুর থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আনা হয়। দুটি হাসপাতালে ঘুরেও ভর্তি করাতে না পেরে শেষে তাকে ডিএনসিসি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে আনা হয়।
হামে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৫০০
হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৫০০ ছুঁয়েছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এ উপসর্গে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি। প্রতিদিন চিরদিনের জন্য বাহুর ওপর ঘুমিয়ে পড়া প্রাণাধিক সন্তানদের নিয়ে শূন্য বুকে হাহাকার করতে করতে মা-বাবা ঘরে ফিরছেন। প্রতিদিন সকালে দৈনিকে চোখ রাখার আগে চোখ বুজে প্রার্থনা করি যেন লেখা থাকে ‘আজ হামে কোনো শিশু মারা যায়নি’। কিন্তু না, এ মৃত্যুর মিছিল থামছেই না।
কোভিডের চেয়েও ভয়াবহ হাম
কোভিড ১৯ শনাক্তের পর আমাদের দেশে প্রথম ২ মাসে মারা গিয়েছিলেন ১৯৮ জন, যার মধ্যে অসুস্থ বয়স্ক ব্যক্তিরাই বেশি ছিলেন। হামে দুই মাসে তার দ্বিগুণ, অধিকাংশই শিশু। কোনো জরুরি অবস্থা ঘোষণা নেই, কোনো ধরনের জরুরি পদক্ষেপ নেই, নেই হাসপাতালে কোনো বিশেষ ইউনিট খোলার তৎপরতা। কেবল একে অন্যের ওপর দায় চাপানোর মহড়া চলছে।
জামগাছের উপমা
এ যেন কৃষণ চন্দরের সেই ‘জামগাছ’ নাটকটির মতো। একদিন রাস্তার মাঝখানে একটি বড় জামগাছ ভেঙে পড়ে। গাছের নিচে একজন মানুষ চাপা পড়েন। কিন্তু তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করার বদলে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের লোকেরা সেখানে এসে তর্ক শুরু করেন। গাছ সরানোর দায়িত্ব কার, কোন বিভাগ আগে কাজ করবে, অনুমতি কোথা থেকে আসবে ইত্যাদি নিয়ে। পুলিশ, পৌরসভা, বন বিভাগসহ নানা অফিসের কর্মচারীরা শুধু নিয়মকানুন আর দায় এড়ানোর কথা বলতে থাকেন। এদিকে গাছের নিচে চাপা পড়া মানুষটি অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকেন। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় পর যখন গাছ সরানো হয়, তখন দেখা যায় লোকটি মারা গেছেন।
রাজনৈতিক দায় চাপানোর মহড়া
হামে মৃত্যুর দায়দায়িত্ব নিয়ে ঠিক এমনটিই হচ্ছে। সরকারি দল বা দলের সমর্থকেরা বলছেন এ হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা, অন্তর্বর্তী সরকার–সমর্থিত লোকজন বলছেন, এটা নিঃসন্দেহে বর্তমান সরকারের গাফিলতি, বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তী ও পলাতক—দুটি সরকারের ওপরই দোষ চাপাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, এটার ভেতর কোনো গভীর ষড়যন্ত্র আছে। মাঝখান থেকে টপাটপ ঝরে পড়ছে মা-বাবা স্বজনের বুকের মানিক ধন।
মনে হচ্ছে একমাত্র ঐশ্বরিক সাহায্য ব্যতীত এর কোনো সমাধান নেই। এমনকি মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, বিদেশের সঙ্গে চুক্তি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি–কাণ্ড—সবকিছুতেই দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
ডেঙ্গু আতঙ্ক
সামনেই বর্ষাকাল। এখনই তার আগমনী শোনা যাচ্ছে। এবার সগৌরবে ডেঙ্গুও কি আসছে? গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৪১৩ জন। হাম নিয়ে যা শুরু হয়েছে, তাতে ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার কোনো কারণ নেই। মৃত্যু, সমালোচনা, দায় এড়ানোর বাহাস শুরু হওয়ার আগে থেকেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে সরকারকে। প্রতিটি এলাকায় প্রতিদিন দুবার করে মশা মারার গ্রহণযোগ্য ওষুধ ছিটাতে হবে এখন থেকেই। এলাকার মশা উৎপাদনকারী জলাশয়, ড্রেন ও অন্যান্য উৎস নিয়মিত পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ নিতে হবে অচিরেই।
আগামীর সংসদ অধিবেশনগুলো যেন কেবল দায় চাপানো ও দায় এড়ানোর মুখোরোচক হট্টগোলে পরিণত না হয়।
উম্মে মুসলিমা সাহিত্যিক।



