অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সাফিন আদিয়াত: পরিবারের সহায়তায় দৈনন্দিন জীবনে অগ্রগতি
অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সাফিন আদিয়াতের বয়স এখন ১৫ বছর। সে স্কুল ফর গিফটেড চিলড্রেনের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা করছে। বর্তমানে সাফিন নিজে দোকান থেকে ওষুধ কিনতে পারে, মুদি দোকান থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করতে পারে এবং বাবার সঙ্গে রান্নার কাজেও অংশগ্রহণ করে। কম্পিউটার চালানো, গেমস খেলা এবং ফেসবুকিং-এর মতো ডিজিটাল কাজেও সে দক্ষতা দেখিয়েছে।
পরিবারের নিবিড় নজরদারি ও সহযোগিতা
তবে সাফিনের এই সব অর্জনের পেছনে রয়েছে তার পরিবারের নিরলস প্রচেষ্টা এবং নিবিড় নজরদারি। যখন সে দোকানে যায়, তখন পরিবার আগে থেকেই দোকানদারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে রাখে। বাড়ি থেকে তাকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়—কত টাকা দেওয়া হলো এবং কত টাকা ফেরত আসবে। নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে গোপনে অনুসরণও করা হয়। পরিবারের এই ধারাবাহিক সহযোগিতা সাফিনকে ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তুলছে।
সমাজে অটিস্টিক শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রমের ঘাটতি
সাফিনের সাফল্য সত্ত্বেও, বাংলাদেশের সমাজে বেশিরভাগ অটিস্টিক শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রমের অভাব রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে শহরাঞ্চলে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ অটিস্টিক শিশু শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারছে। কিন্তু প্রান্তিক ও গ্রামীণ অঞ্চলে এই সংখ্যা মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস ও সরকারি উদ্যোগ
'অটিজম কোনো সীমাবদ্ধতা নয়—প্রতিটি জীবন মূল্যবান' এই প্রতিপাদ্য নিয়ে দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। দিবসটি উপলক্ষ্যে সরকার ২০ এপ্রিল একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করার ঘোষণা দিয়েছে। এই অনুষ্ঠানে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের অধিকার ও সেবা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
অভিভাবকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সংগ্রাম
অটিস্টিক শিশুদের পরিবারগুলোর মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জগুলো অত্যন্ত জটিল। শাহানা আসিরের ২০ বছর বয়সী ছেলে জামি অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এবং অত্যন্ত বেপরোয়া আচরণ করে। সে হঠাৎ আঘাত করে, জিনিসপত্র ভেঙে ফেলে এবং চিৎকার করে। শাহানার আরেকটি শিশু ডাউন সিনড্রোম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, তবে সে তুলনামূলকভাবে শান্ত। জামিকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া একটি কষ্টকর প্রক্রিয়া, কারণ সে বসে থাকতে পারে না। আইন অনুযায়ী, অটিস্টিক রোগীদের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও বেশিরভাগ চিকিৎসক এই নিয়ম মেনে চলেন না।
মিলি জেসমিনের ২৫ বছর বয়সী ছেলে সিয়াম জাহিদ অঙ্কনে দক্ষ, কিন্তু সামাজিক অনুষ্ঠানে তাকে নিয়ে যাওয়ার সময় মিলি প্রায়শই অবাঞ্ছিত বোধ করেন। তিনি ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন, বিশেষ করে যখন তিনি থাকবেন না তখন তার ছেলের কী হবে এই চিন্তায় কেঁদে ফেলেন।
সুইড বাংলাদেশের ভকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে তাহমিনা আক্তারের ছেলে এইমানুল হক (২২) অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। তাহমিনা তার হাতে ছেলের কামড়ের চিহ্ন দেখিয়ে বলেন, "আমি ধৈর্য ধরে থাকি, যেন আমার হাত তার গায়ে না ওঠে।"
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সুপারিশ
বি-স্ক্যানের নির্বাহী পরিচালক সালমা মাহবুব বলেন, "গত সরকারের আমলে অটিজম নিয়ে প্রচার-প্রচারণা বেশি ছিল, কিন্তু মৌলিক কাজ কম হয়েছে। এখনো অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্নদের জন্য হাসপাতালে বিশেষ চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত।"
সুইড বাংলাদেশের ভকেশনাল স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাহমুদা খানম কনা জানান, ২০২২ সাল থেকে স্কুলের ১২ জন শিক্ষার্থীকে সুইডের বিভিন্ন বিভাগে কর্মে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা নিয়মিত কাজ করলে ভালো পারফর্ম করে, কিন্তু ছুটির পরে তাদের কাজ ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
পরিসংখ্যান ও আইনি প্রেক্ষাপট
নিউরোডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৯৮ হাজার ৫০৩ জন অটিস্টিক ব্যক্তি রয়েছে, তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়। এনডিডি ট্রাস্ট আইনের বিধিমালায় আবাসন নির্মাণ, বিশেষ কক্ষের ব্যবস্থা, সহজে ব্যবহারযোগ্য বৈদ্যুতিক সুইচ এবং কেয়ারগিভার নিয়োগের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এনডিডি ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক আবু তয়ৈব খান জানান, ৯৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮টি বিভাগে সেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে। ঢাকাসহ ১৪টি সেন্টারে অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু দক্ষতা ও কর্মসংস্থান বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এখনো অপ্রতুল।
অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও সমন্বিত ব্যবস্থার আহ্বান
তরী ফাউন্ডেশন ও স্কুল ফর গিফটেড চিলড্রেনের পরিচালক মারুফা হোসেন বলেন, "অটিস্টিক ব্যক্তিদের অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সবাই সমানভাবে কাজ করতে পারবে না। তাই একটি সমন্বিত ও মানবিক ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে 'কাজ করতে সক্ষম' এবং ‘পূর্ণ সহায়তা প্রয়োজন' উভয় ধরনের মানুষই সম্মানজনক জীবন পাবে।"
সুইড বাংলাদেশের মহাসচিব মাহবুবুল মুনির জোর দিয়ে বলেন, "আইনের বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। শহর ও গ্রামে অটিস্টিক ব্যক্তিদের ওপর গবেষণা করে তাদের কর্মসংস্থানের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করতে হবে, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষিত করতে হবে।"



