চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এমআরআই যন্ত্র আবারও বিকল, রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের এমআরআই (ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং) যন্ত্রটি মেরামতের মাত্র ৯ মাস পর আবারও বিকল হয়ে পড়েছে। ৬ মার্চ থেকে যন্ত্রটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ থাকায় রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে উচ্চ খরচে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে।
যন্ত্রের ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
২০১৭ সালের ১৬ আগস্ট প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে চমেক হাসপাতালে এমআরআই যন্ত্রটি বসানো হয়। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ছিল মেডিটেল প্রাইভেট লিমিটেড। তিন বছর ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২১ সালের মে মাসে যন্ত্রটি প্রথমবারের মতো বিকল হয়। এরপর ২০২২ সালের মে মাসে এটি প্রায় পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং টানা তিন বছর ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। গত বছরের জুন মাসে ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৫৬ হাজার টাকা খরচ করে মেরামতের পর যন্ত্রটি আবার চালু করা হয়।
কিন্তু সম্প্রতি যন্ত্রটির ‘গ্র্যাডিয়েন্ট অ্যামপ্লিফায়ার’ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এটি আবার বিকল হয়ে পড়েছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেডিটেলকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং মেরামতের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মেডিটেলের চট্টগ্রাম শাখার প্রধান প্রকৌশলী শফিক আহমেদ জানান, যন্ত্রটির ১২টি গ্র্যাডিয়েন্ট ইউনিটের একটি নষ্ট হয়েছে, যা ওয়ারেন্টির আওতায় নেই।
রোগীদের ভোগান্তি ও আর্থিক চাপ
চমেক হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০টি এমআরআই করা হয়, যা রোগীর চাপের তুলনায় অপ্রতুল। সরকারি হাসপাতালে এমআরআই পরীক্ষার খরচ ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা, কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে এটি ৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী গীতা দাশ গুপ্তের ছেলে সমীর দাশ গুপ্ত বলেন, ‘এত টাকা দিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর সাধ্য সবার নেই। তাই সরকারি হাসপাতালে থাকা যন্ত্রটি দ্রুত মেরামত করা দরকার। যাঁদের সামর্থ্য নেই, তাঁদের জন্য স্বল্পমূল্যে পরীক্ষার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখা উচিত।’ তিনি বেসরকারি হাসপাতালে প্রায় ১৮ হাজার টাকায় এমআরআই করাতে বাধ্য হয়েছেন, যা জোগাড় করতে আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতা নিতে হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
চমেকের রেডিওলজি বিভাগের প্রধান কাজী মো. আলম জানান, যন্ত্রটি পুরোনো এবং একটি এমআরআই সম্পন্ন করতে প্রায় ৪০ মিনিট সময় লাগে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, ‘রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি অকেজো এমআরআই মেশিন আছে। সেখানে এই যন্ত্রাংশটি ভালো। সেই যন্ত্রাংশটি এখানে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। যেহেতু সরকারি মেশিন থেকে আনা হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে ব্যয় হবে না।’
এছাড়া, হাসপাতালের নতুন রেডিওলজি ভবনে নতুন দুটি এমআরআই মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির অভাব
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০১৯ সালে সেন্ট্রাল মেইনটেন্যান্স কন্ট্রাক্ট (সিএমসি) চালুর নির্দেশনা দিলেও চমেক এখনো এমআরআই যন্ত্রের জন্য এই চুক্তি করেনি। মেডিটেলের কর্মকর্তারা জানান, সিএমসির আওতায় থাকলে যন্ত্রাংশ মেরামতে খরচ হতো না। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ৬ শতাংশ হারে রক্ষণাবেক্ষণ খরচের বিষয়ে একমত হতে পারেনি মেডিটেল, ফলে সিএমসি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি।
এই অবস্থায় পার্বত্য জেলা, কক্সবাজার, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা রোগীরা চিকিৎসা সেবায় বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন, যা সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
