শ্রীমঙ্গল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমপির আকস্মিক পরিদর্শন, রোগীদের সঙ্গে কথা ও প্রতিশ্রুতি
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ঢাকায় শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই নিজ এলাকায় ফিরেছেন মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী। এলাকায় ফিরেই তিনি কোনো সংবর্ধনা বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ না নিয়ে সরাসরি ছুটে গেছেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল জনগণের চিকিৎসাসেবার প্রকৃত অবস্থা নিজের চোখে দেখা এবং সরাসরি মূল্যায়ন করা।
রোগীদের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন ও দুধ উপহার
রোববার দুপুরে শ্রীমঙ্গল চৌমুহনায় একটি নির্ধারিত পথসভা বাতিল করে দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মুজিবুর রহমান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পৌঁছে নেতা-কর্মীদের বাইরে রেখে ভেতরে প্রবেশ করেন তিনি। এরপর তিনি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরে রোগীদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেন এবং তাদের চিকিৎসা ও সেবার মান সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। অনেক রোগীর শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি মনোযোগ দিয়ে তাদের অভিযোগ ও অভিজ্ঞতার কথা শোনেন। এ সময় প্রত্যেক রোগীকে তিনি এক প্যাকেট করে গরুর দুধ উপহার দেন, যা তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়ক হতে পারে বলে উল্লেখ করেন।
চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে আলোচনা ও সমস্যা শোনা
পরবর্তীতে মুজিবুর রহমান হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে একটি বিস্তারিত আলোচনায় বসেন। তাঁদের কাছ থেকে তিনি জনবল সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যন্ত্রপাতির ঘাটতি এবং অ্যাম্বুলেন্স সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিল বিষয় শোনেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুরে আলম সিদ্দিকী এবং উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমদ প্রমুখ ব্যক্তিত্ব। চিকিৎসকরা দীর্ঘদিন ধরে এই সংকটগুলোর মুখোমুখি হচ্ছেন বলে জানান, এবং সংসদ সদস্যের এই আকস্মিক পরিদর্শনকে একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে ব্যক্ত করেন।
এমপির প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে মুজিবুর রহমান বলেন, 'ঢাকায় শপথ নেওয়ার পর কয়েক দিন সেখানে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল যত দ্রুত সম্ভব নিজের এলাকায় ফিরতে হবে। কারণ, এই মানুষগুলোর ভোটেই আমি সংসদ সদস্য হয়েছি। তাই আনুষ্ঠানিকতা নয়, কাজ দিয়েই দায়িত্ব শুরু করতে চেয়েছি। এলাকায় ঢুকেই মনে হলো, প্রথমে হাসপাতালে যাই। মানুষের চিকিৎসাসেবা কেমন চলছে, সেটা নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না।' তিনি আরও যোগ করেন যে হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি রয়েছে, পর্যাপ্ত বেড নেই, এবং মাত্র একটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে পুরো এলাকার চাহিদা মেটানো কঠিন। তবে চিকিৎসকদের আন্তরিক প্রচেষ্টাকে তিনি সাধুবাদ জানান।
মুজিবুর রহমান জানান, তিনি খুব দ্রুত স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন এবং প্রয়োজনীয় জনবল বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া, তিনি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এড়াতে এলাকায় ফেরার পথে একটি পথসভা বাতিল করেছিলেন, যা তাঁর জনসেবামূলক মনোভাবকে প্রতিফলিত করে।
রোগী ও চিকিৎসকের প্রতিক্রিয়া
হাসপাতালে আছিয়া বেগম নামের এক রোগী বলেন, 'এমপি সাহেব নিজে এসে আমাদের খোঁজখবর নিয়েছেন, চিকিৎসা ঠিকমতো পাচ্ছি কি না জিজ্ঞেস করেছেন। আগে কখনো কোনো এমপিকে এভাবে রোগীদের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখিনি। তিনি যদি কথাগুলো রাখেন, তাহলে হাসপাতালের অবস্থা অনেক ভালো হবে।' অন্যদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক বলেন, 'সংসদ সদস্যের এই আকস্মিক পরিদর্শন আমাদের জন্য ইতিবাচক বার্তা। আমরা দীর্ঘদিন ধরে জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটের মধ্যে কাজ করছি। বিষয়গুলো তাঁকে খোলামেলাভাবে জানিয়েছি। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা আশাবাদী, বাস্তব পরিবর্তন আসবে।'
নির্বাচনী পটভূমি ও উন্নয়নের প্রত্যাশা
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে মুজিবুর রহমান চৌধুরী ১ লাখ ২০ হাজার ভোটের বেশি ব্যবধানে জয়ী হন। তিনি মোট ১ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৭ ভোট পান, যেখানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় নির্বাচনী জোটের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শেখ নূরে আলম হামিদী ৫০ হাজার ২০৪ ভোট পান। মুজিবুর রহমান জানান, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে রাস্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—সবখানেই উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। তিনি দুই উপজেলাকে একটি আদর্শ ও মডেল এলাকায় পরিণত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং ধাপে ধাপে সব কাজ শুরু করার ঘোষণা দেন।
