ডিজিটাল সেবায় প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তি জরুরি: বিশেষজ্ঞরা
ডিজিটাল সেবায় প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তি জরুরি

ডিজিটাল সেবায় অগ্রগতির ক্ষেত্রে সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল প্রযুক্তি শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা, কর্মসংস্থান ও দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও দ্রুত ডিজিটাল সেবার বিস্তার ঘটছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নাগরিক সেবাকে আরও সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে কাজ করছে। কিন্তু এই অগ্রগতির মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: এই ডিজিটাল সেবাগুলো কি সবার জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য? বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বয়স্ক নাগরিক কিংবা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় থাকা মানুষের জন্য কি এসব সেবা বাস্তব অর্থে অ্যাকসেসিবল বা সহজপ্রাপ্য?

ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটি কী?

ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটি বলতে এমন প্রযুক্তি, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ বা ডিজিটাল সেবা বোঝায়, যা সব ধরনের মানুষ, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারেন। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি স্ক্রিন রিডারের মাধ্যমে ওয়েবসাইট ব্যবহার করবেন, একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি ভিডিওর ক্যাপশন বা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ সহায়তার মাধ্যমে তথ্য বুঝবেন, আবার একজন ব্যক্তি শুধু কিবোর্ড ব্যবহার করেই সেবা গ্রহণ করতে পারবেন—এটাই ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটির মূল দর্শন।

বাংলাদেশে বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ হলেও বাস্তবতায় এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। অধিকাংশ ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ আন্তর্জাতিক অ্যাকসেসিবিলিটি মানদণ্ড, বিশেষ করে ওয়েব কনটেন্ট অ্যাকসেসিবিলিটি গাইডলাইনস (ডব্লিউসিএজি) অনুসরণ করে তৈরি করা হয় না। ফলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি অনেক সময় স্ক্রিন রিডার দিয়ে তথ্য পড়তে পারেন না, গুরুত্বপূর্ণ বাটনগুলো শনাক্ত করতে পারেন না বা অনলাইন ফরম পূরণে সমস্যার সম্মুখীন হন। একইভাবে শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ভিডিও কনটেন্টে ক্যাপশন বা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ সুবিধা না থাকায় তথ্যপ্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলা ভাষাভিত্তিক ডিজিটাল কনটেন্টের ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক ওয়েবসাইট ও অ্যাপ বাংলা ইউনিকোড সঠিকভাবে ব্যবহার না করায় স্ক্রিন রিডারে তথ্য সঠিকভাবে পাঠ করা যায় না। আবার অনেক ডিজিটাল সেবায় কনট্রাস্ট, ফন্ট সাইজ বা নেভিগেশন যথাযথ না হওয়ায় বয়স্ক ব্যক্তি বা কম দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন মানুষের জন্য ব্যবহার কঠিন হয়ে পড়ে।

অ্যাকসেসিবিলিটি একটি মৌলিক অধিকার

এই বাস্তবতায় ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক অধিকার। জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদ (ইউএনসিআরপিডি) অনুযায়ী তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিতে সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। বাংলাদেশেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন রয়েছে, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নীতিমালার পাশাপাশি বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

অ্যাকসেসিবিলিটি বাই ডিজাইন

সরকারি ও বেসরকারি খাতে ডিজিটাল সেবা উন্নয়নের সময় 'অ্যাকসেসিবিলিটি বাই ডিজাইন' ধারণাকে গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ শুরু থেকেই ডিজাইন, ডেভেলপমেন্ট ও বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে অ্যাকসেসিবিলিটি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পরে অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে নয়, বরং এটি একটি বাধ্যতামূলক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে অ্যাসপাইয়ার টু ইনোভ্যাট (এটুআই) প্রোগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকারি ডিজিটাল সেবাগুলোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে a2i বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, সরকারি কর্মকর্তা ও প্রযুক্তিবিদদের প্রশিক্ষণ, অ্যাকসেসিবিলিটি গাইডলাইন উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সরকারি প্ল্যাটফর্মে অ্যাকসেসিবিলিটি বিষয়ক সহায়তা প্রদান। এসব উদ্যোগের ফলে ধীরে ধীরে সরকারি সেবায় অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা ও সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরাসরি সম্পৃক্ততা

তবে শুধু নীতিমালা বা প্রযুক্তিগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরাসরি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা। 'নাথিং অ্যাবাউট আস উইদাউট আস' নীতি অনুসরণ করে ডিজিটাল সেবা উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, বাস্তব ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা ছাড়া প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রযুক্তি তৈরি সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

বিশ্বব্যাপী এখন ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটিকে মানবাধিকার ও টেকসই উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে সরকারি ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল সেবায় অ্যাকসেসিবিলিটি নিশ্চিত করা আইনগত বাধ্যবাধকতা। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোও এখন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশেও এই ধারা আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

প্রতিবছর মে মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার গ্লোবাল অ্যাকসেসিবিলিটি অ্যাওয়ারনেস ডে (জিএএডি) পালিত হয়। এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিকে সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য করার গুরুত্ব তুলে ধরা। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, প্রযুক্তিবিদ, নাগরিক সমাজ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন এখন এ বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত।

সবার জন্য ডিজিটাল বাংলাদেশ

বাংলাদেশে ডিজিটাল রূপান্তর তখনই সফল হবে, যখন কোনো ব্যক্তি শুধু প্রতিবন্ধকতার কারণে ডিজিটাল সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন না। প্রযুক্তি তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের হাতিয়ার হবে, যখন তা সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত থাকবে। তাই এখনই সময় ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটিকে উন্নয়নের মূলধারায় নিয়ে আসার। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, প্রযুক্তিবিদ এবং নাগরিক সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। কারণ, অ্যাকসেসিবিলিটি শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি সমতা, মর্যাদা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। আর একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে অগ্রসর হয়, যখন সেখানে কেউ পিছিয়ে থাকে না।

ভাস্কর ভট্টাচার্য্য ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটি বিশেষজ্ঞ ও প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী