জ্বালানি সংকটে শিক্ষাকে বলি দেওয়ার পরিকল্পনা: একটি জাতীয় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে অনিশ্চিত খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। এই সংকটের ঢেউ বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানছে, সরকারকে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি আমদানি সচল রাখতে হচ্ছে। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক বাজেটে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে 'সফট টার্গেট' বানানোর যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের জ্বালানি সাশ্রয় নীতি অত্যন্ত যৌক্তিক হলেও, নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ইঙ্গিত আসছে যে এই সাশ্রয়ের প্রথম বলি হবে শিক্ষা খাত। বিশেষ করে মহানগর এলাকার স্কুল ও কলেজগুলোতে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাসের পরিকল্পনা নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাবিদদের মনে তীব্র শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন জাগে, জাতীয় সংকটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন প্রথম লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়?
করোনাকালের দীর্ঘ আড়াই বছরের স্থবিরতা শিক্ষার্থীদের শিখনে অপূরণীয় ক্ষতি করেছে, যার রেশ এখনো কাটেনি। বছরের প্রথম তিন মাসে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ, জাতীয় নির্বাচন ও রমজানের ছুটির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ব্যাপক শিখনঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই 'লার্নিং লস' কাটিয়ে উঠতে সরকার সম্প্রতি ১০ সপ্তাহ ধরে শনিবারও ক্লাস চালু রাখার সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু নতুন অনলাইন ক্লাসের প্রস্তাব সেই অর্জনকে ধূলিসাৎ করতে পারে।
অনলাইন ক্লাসের কার্যকারিতা ও ডিজিটাল বিভাজনের চ্যালেঞ্জ
অনলাইন ক্লাসের কার্যকারিতা নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়। করোনাকালে ডিজিটাল বিভাজন শিক্ষাব্যবস্থাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। মহানগর এলাকায় উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও আধুনিক ডিভাইসের সুবিধা পেলেও, বস্তি এলাকা বা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য স্মার্টফোন বা ডেটা প্যাক কেনা বিলাসিতা। তদুপরি বাংলাদেশের ইন্টারনেট অবকাঠামো নাজুক, জুম বা গুগল মিটে নিরবচ্ছিন্ন ক্লাস করা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিংয়ের সমস্যাও রয়ে গেছে।
ফলে অনলাইন ক্লাস মানে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য নামমাত্র হাজিরা, যা প্রকৃত শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে মিথস্ক্রিয়া ও সামাজিকীকরণের সুযোগ কোনো পর্দার মাধ্যমেই প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
জ্বালানি সাশ্রয়ের গাণিতিক ভিত্তি ও বিকল্প সমাধান
জ্বালানি সাশ্রয়ের অজুহাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে নেওয়ার গাণিতিক ভিত্তি নড়বড়ে। মহানগর এলাকার সিংহভাগ শিক্ষার্থী রিকশায় যাতায়াত করে, যার অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত। এই রিকশাগুলো বিদ্যুতে চার্জড হয়, যা সরাসরি জ্বালানি তেল ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত নয়। ব্যক্তিগত গাড়ি বা স্কুলবাসে যাতায়াতকারীদের সংখ্যা মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় নগণ্য।
এখন প্রশ্ন হলো, সামান্যসংখ্যক শিক্ষার্থীর যাতায়াত বন্ধ করে সরকার কতটুকু জ্বালানি সাশ্রয় করতে পারবে? এর বিপরীতে অনলাইন ক্লাসের জন্য লাখ লাখ স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও রাউটার সচল থাকলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। জ্বালানি সাশ্রয় করতে গিয়ে এক প্রজন্মের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করা দেশের পক্ষে কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।
সরকারি কর্মকর্তাদের প্রটোকল ও যাতায়াতে বিশাল জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, শপিং মল ও অফিসে এসির ব্যবহার সীমিত করা, এবং ব্যাটারিচালিত রিকশার অযৌক্তিক চার্জিং বন্ধ করে বিকল্প সাশ্রয় নিশ্চিত করা যেতে পারে। উন্নত দেশগুলো যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবার শেষে বন্ধ করে, কারণ তারা জানে সঠিক শিক্ষা ছাড়া জাতি সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে না।
শিক্ষার স্থায়ী ক্ষতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হুমকি
কোনো অবস্থাতেই সরাসরি পাঠদান বা অফলাইন ক্লাস বন্ধ করা উচিত নয়। শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়া মানে কিশোর-কিশোরীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা ও বিপথে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা। করোনাকালে দীর্ঘ বিরতিতে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার ও বাল্যবিবাহ বেড়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি অগ্রহণযোগ্য।
পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে নেওয়ার এই পরিকল্পনা অদূরদর্শী ও জাতীয় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। জ্বালানি সংকট সাময়িক বৈশ্বিক সমস্যা, কিন্তু শিক্ষার ক্ষতি স্থায়ী ও প্রজন্মব্যাপী। সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হবে, জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গায়ে হাত দেওয়ার আগে অন্য সব বিকল্প পথ শতভাগ ব্যবহার করে দেখতে হবে। শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলে বিশ্বাস করলে, সেই মেরুদণ্ডে কুঠারাঘাত চরম হঠকারিতা।



