খুলনার অপরাধজগৎ নিয়ে অনুসন্ধানে বারবার একটি নাম এসেছে—তৈমুর ইসলাম। পদে তিনি একজন পুলিশ পরিদর্শক। বর্তমানে খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) কর্মরত। কিন্তু ভুক্তভোগী, স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের অভ্যন্তরীণ নথিতে তাঁর পরিচয় শুধু একজন পুলিশ সদস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মামলা, গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি, অর্থ আদায় ও অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে তিনি খুলনায় এক ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য
তৈমুর ইসলামের বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে ১৩ ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হয়েছে প্রথম আলোর। তাঁদের ৯ জনই নাম প্রকাশে রাজি হননি। তাঁদের অভিযোগ, তৈমুরের বিরুদ্ধে কথা বললে প্রশাসনিক চাপে পড়ার আশঙ্কা থাকে। কারও বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া, প্রতিষ্ঠান দখলে সহযোগিতা করতে কাউকে তুলে নিয়ে গ্রেপ্তার দেখানো, মামলায় ঢোকানো ও গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলার অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
পেশাগত জীবন ও যোগাযোগ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর তৈমুর ইসলাম কেএমপিতে যোগ দেন। এর পর থেকে তিনি কেএমপির ডিবি পরিদর্শক (ওসি) হিসেবে কর্মরত। খুলনার সঙ্গে তৈমুরের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। পুলিশের নথিতে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা খুলনা সদরের খানজাহান আলী সড়কে। পড়েছেন খুলনার আজম খান সরকারি কমার্স কলেজে। চাকরিজীবনের বড় সময়ও কাটিয়েছেন খুলনায়। স্থানীয় শিকড় ও চাকরির দীর্ঘ যোগাযোগ—সব মিলিয়ে তিনি পুলিশের ভেতর ও বাইরে আলাদা একটি বলয় তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।
বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠজন
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পুলিশের আলোচিত আইজিপি বেনজীর আহমেদের ‘ঘনিষ্ঠজন’ হিসেবেও বাহিনীতে তৈমুর পরিচিত ছিলেন। বেনজীর র্যাবের মহাপরিচালক ও আইজিপি থাকাকালে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের বৈরাগীরটোলায় সাভানা ইকোরিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক গড়ে তোলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই রিসোর্টের জন্য জমি কেনার তত্ত্বাবধানে ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা তৈমুর। ওই সব জমি যেসব পরিবার থেকে নেওয়া হয়েছিল, তাঁদের ২৭ সদস্যের সঙ্গে ২০২৪ সালের মে মাসে কথা বলেছিল প্রথম আলো। তাঁদের মধ্যে ২৫ জনই তখন বলেছিলেন, জমি বিক্রিতে তাঁদের বাধ্য করা হয়েছে; ভয় দেখিয়েছেন পুলিশ পরিদর্শক তৈমুর ইসলাম। তবে তৈমুর এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বদলির আদেশ ও তদবির
তৈমুরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধ-অনিয়মে জড়ানোর বিষয়টি পুলিশের অভ্যন্তরীণ নজরদারি ইউনিট পুলিশ ইন্টারনাল ওভারসাইটের (পিআইও) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরে সেই প্রতিবেদন ধরে কেএমপির অনুসন্ধান শেষে তাঁকে অন্য কোনো ইউনিটে বদলির সুপারিশও করা হয়েছিল। গত বছরের ১৬ অক্টোবর তাঁকে ট্যুরিস্ট পুলিশে বদলির প্রজ্ঞাপন হয়। তাঁকে ২৫ অক্টোবরের মধ্যে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদানের জন্য ছাড়পত্র নিতে বলা হয়। অন্যথায় ২৬ অক্টোবর থেকে তিনি তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) হয়েছেন বলে গণ্য হবেন বলেও উল্লেখ ছিল। তৈমুর সেই বদলির আদেশ বাতিলের আবেদন করলে ১৮ নভেম্বর তা নামঞ্জুর হয়। এর চার দিন পর ২৩ নভেম্বর ট্যুরিস্ট পুলিশে তাঁর পদায়নের আদেশ বাতিল করে খুলনা রেঞ্জে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, তৈমুরের বদলির আদেশের পর সেটি বাতিলের জন্য তখন ‘বড় বড় জায়গা’ থেকে তদবির আসে। এ কারণে বদলিকৃত স্থানে যোগ না দিলেও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় দখল ও মামলা
খুলনার প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি দখল নিয়েও তৈমুরের নাম এসেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রতিষ্ঠানটিতে বিএনপির কয়েকজন নেতাসহ কিছু ব্যক্তির চোখ পড়ে। পরে প্রতিষ্ঠানটি দখল করারও অভিযোগ ওঠে। শুরুতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক। এরপর বিএনপি-সমর্থিত সিরাজুল হক চৌধুরী ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হন। প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টিদের তিনজন প্রথম আলোকে জানান, এরপর মিজানুর রহমান ও হাফিজুর রহমান নামের দুজনকে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য করতে চাপ দেন খুলনা মহানগর বিএনপির এক শীর্ষ নেতা। মামলার বাদী পবিত্র কুমার সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৫ সালের ২১ মে সিরাজুল হক চৌধুরীকে সরিয়ে মিজানুর রহমান নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। সদস্যসচিব হন হাফিজুর রহমান। তখন তিনিসহ (ওবায়দুল্লাহ) আরও দুই প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি পবিত্র কুমার সরকার ও সিরাজুল হক চৌধুরীকে ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন মিজানুর। মিজানুর ও হাফিজুরের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে খুলনার সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন পবিত্র কুমার সরকার। আদালত গত ১৩ জানুয়ারি ট্রাস্টি হিসেবে মিজানুর ও হাফিজুরের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন। এই আদেশের বিরুদ্ধে মিজানুর আপিল করলে ১৫ এপ্রিল শুনানির তারিখ নির্ধারিত হয়। এর আগে ৪ এপ্রিল গভীর রাতে মামলার বাদী পবিত্র কুমার সরকারকে বাড়ি থেকে তুলে নেয় কেএমপির ডিবি পুলিশ। পরে তাঁকে দোকান ভাঙচুরের পুরোনো একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। যদিও সেই মামলার এজাহারে তাঁর নাম ছিল না। পবিত্র সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার পর তাঁকে ডিবির পরিদর্শক তৈমুর বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত মামলা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তাঁর ভাষ্য, ‘আমাকে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করা হয়, “মামলা করছিস কয়টা? ”আমি বলি, একটা। তখন বলা হয়, “এই আমলে তুই মামলা করিস! তোকে এত সাহস দিয়েছে কে?” আমি বলি, বিশ্ববিদ্যালয় দখল হয়েছে বলে আমি মামলা করেছি।’ পবিত্র সরকারের অভিযোগ, ডিবি হেফাজতে তাঁকে শারীরিকভাবেও আঘাত করেন তৈমুর। তিনি অধস্তন পুলিশ সদস্যদের পবিত্র সরকারের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা প্রস্তুত করতে বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত মামলার তারিখের ঠিক আগেই তাঁকে তুলে নিয়ে এভাবে চাপে ফেলা হয়। ৩২ দিন কারাভোগের পর ৬ মে জামিনে মুক্ত হন তিনি। তবে তিনি এখনো ভয়ে নিজ বাড়িতে থাকছেন না। এ দিকে এর আগে ৩ মে মিজানুরের আপিলও খারিজ হয়; তাঁদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। পবিত্র সরকারের অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তৈমুর। তাঁর দাবি, পবিত্র সরকারের বিষয়টি রাজনৈতিক এবং এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন। আর হয়তো বাদী বলতে পারবেন। খুলনা সদর থানার যে মামলায় পবিত্র সরকারকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়, সেটির বাদী ফাতেমা-তুজ-জোহরা (লিন্ডা)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামলার যা করার পুলিশ করছে। আমি কিছু জানি না। পবিত্র সরকারকে আমি আগে চিনতাম না। তাঁকে গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে পুলিশকে বলেছি, আমার মামলায় যেন কোনো নির্দোষ মানুষকে হয়রানি করা না হয়।’
পুলিশের প্রতিবেদনে গুরুতর অভিযোগ
পুলিশের ইন্টারনাল ওভারসাইটের (পিআইও) প্রতিবেদনে তৈমুর ইসলামের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়ানোর অনেকগুলো অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে আছে আটক করে টাকা দাবি, মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো, ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে উৎকোচ গ্রহণ, জব্দ তালিকা ছাড়াই গাড়ি নিয়ে যাওয়া, চিহ্নিত অপরাধীকে গ্রেপ্তার না করার শর্তে টাকা নেওয়া এবং জুয়া, মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অবৈধ কারবারের ‘স্পট’ থেকে মাসিক টাকা আদায়ের অভিযোগ। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি রূপসা মাছবাজারের ব্যবসায়ী গোপাল বিশ্বাসকে খুলনা সদরের বড় বাজার এলাকা থেকে আটক করে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এরপর দুটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ভয় দেখিয়ে ৩০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। দর-কষাকষির পর তৈমুরের জন্য ১৫ লাখ এবং বিএনপির স্থানীয় এক নেতার জন্য ৭ লাখ টাকা মোট ২২ লাখ টাকা দেওয়ার পর গোপাল বিশ্বাসকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। আরেক ঘটনায় বলা হয়েছে, গত বছরের ২১ জানুয়ারি রূপসা বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকা থেকে একটি প্রাইভেট কার জব্দ তালিকা ছাড়াই অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায় ডিবি। গাড়ির মালিক জুলেখা বেগম ওরফে জুলেখা ডাকাত। জুলেখার ছেলেও হত্যা মামলার আসামি ও অস্ত্রধারী কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণকারী। গাড়িটি জব্দ করার পর এই পরিবারের কাছ থেকে বিকাশে দুই লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে গাড়িটি তৈমুর ইসলামের নামে লিখে দিতে চাপ দেওয়া হয়; তা না হলে পাঁচ লাখ টাকা দিতে বলা হয়। পিআইওর প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের ৬ জানুয়ারি রাতে তৈমুর ইসলামের নেতৃত্বে খুলনার দক্ষিণ টুটপাড়ায় লন্ডনপ্রবাসী মো. তৌহিদুল ইসলামের (তপু) বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। বাড়ির ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাঁকে আটক এবং তাঁর স্ত্রীর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। পরে ৪৫ হাজার টাকা নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আরেক আসামিকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ৩০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও এসেছে পিআইওর প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়, খুলনা সদর থানার একটি মামলার আসামি নুর আজিমকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে তৈমুর ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। পরে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে এক ব্যক্তির মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হয় বলে পুলিশের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। পিআইওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুলনা ও লবণচরা থানা এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও হত্যা মামলার আসামি ইয়াকুব আলীকে গ্রেপ্তার না করার শর্তে এক লাখ টাকা উৎকোচ নেন তৈমুর। এভাবে অভিযান, ভয়ভীতি ও টাকা লেনদেনের আরও কিছু অভিযোগ রয়েছে। তবে তৈমুর ইসলামের দাবি, পিআইওর প্রতিবেদনে আসা সব কটি অভিযোগই মিথ্যা।
শাস্তির তালিকা বড়, তবু কমেনি দাপট
১৯৯৫ সালে উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে পুলিশে যোগ দেন তৈমুর ইসলাম। পুলিশ সদর দপ্তরের পার্সোনাল ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, চাকরিতে যোগদানের পর অন্তত আটবার বিভাগীয় শাস্তির মুখে পড়েছেন তিনি। নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩ এপ্রিল তাঁর এক বছরের জ্যেষ্ঠতা বাজেয়াপ্ত করা হয়। কারণ হিসেবে উল্লেখ আছে, স্ত্রীর করা ফৌজদারি মামলার আসামি হয়ে তিনি হাজতবাস করেছেন। তদন্তে ডিএমপির অধস্তন কর্মকর্তাদের শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালার একাধিক বিধির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়। এর আগে ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর তাঁর বিরুদ্ধে আরও গুরুতর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নথিতে বলা হয়েছে, অবৈধ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের চাঁদা আদায়ের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিত করা হয়। এর বাইরে ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, যথাসময়ে কেস ডায়েরি সার্কেল অফিসে না পাঠানোসহ নানা কারণে তাঁকে একাধিকবার তিরস্কার ও সতর্ক করা হয়। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় খুলনায় তৈমুরের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে একটি মামলাও হয়েছে। মামলাটির তদন্ত এখনো চলছে বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক (খুলনা) মামুনুর রশীদ চৌধুরী। গত ১৭ এপ্রিল তৈমুরের বিষয়ে তথ্য চেয়ে দুদক থেকে খুলনা মহানগর পুলিশের কাছে আর্থিক নানা তথ্যও চাওয়া হয়েছে। এসব ঘটনাকেও ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ ও ‘ভুল ধারণা’ বলে দাবি করেন তৈমুর ইসলাম। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, অপরাধীদের ধরতে কখনো কখনো এক পক্ষের তথ্য অন্য পক্ষের কাছ থেকে নিতে হয়। বেনজীর পরিবারের জমি কেনায় ভূমিকার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। দুদকের মামলাগুলো উদ্দেশ্যমূলক বলে মন্তব্য করেন।
কেএমপি কমিশনারের বক্তব্য
এ বিষয়ে কেএমপি কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, তৈমুর ইসলামের বিরুদ্ধে এখনো তাঁর কাছে কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেননি। বদলির আদেশ বাতিলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘স্ট্যান্ড রিলিজের’ বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে কোনো কর্মকর্তা যদি ব্যক্তিগত অবস্থান ব্যবহার করে অনিয়ম, দুর্নীতি বা প্রভাব বিস্তার করেন, তা অবশ্যই অন্যায় এবং বিচারের দাবি রাখে। তৈমুরের সঙ্গে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর যোগাযোগের বিষয়ে কেএমপি কমিশনার বলেন, এ ধরনের কথা তিনিও শুনেছেন। তবে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলা মানেই অপরাধমূলক যোগাযোগ নয়। একজন পরিদর্শক টাকা বা প্রভাব খাটিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করবেন—এমন ধারণার সঙ্গে তিনি একমত নন।
সংগঠিত অপরাধের কাঠামো
শুধু তৈমুর নন, আরও আছে খুলনার অপরাধজগতের অনুসন্ধানে বিভিন্ন পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের যোগসাজশ ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। তৈমুর ইসলাম ছাড়াও খুলনা মহানগর পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের একটি থানার ওসিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ১৭ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। লবণচরা থানা ও ক্যাম্পের চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন কলকারখানার মতো প্রতিষ্ঠান থেকে ‘বকশিশ’ উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। ওই অভিযোগে ১৮ মার্চ কেএমপি কমিশনার তাঁদের পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করেন। সর্বশেষ ৫ জুন খুলনা থানার এসআই মিয়া রবের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ীকে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছে কেএমপির একটি সূত্র। খুলনার অপরাধজগতের এই চিত্র শুধু কয়েকটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, কয়েকজন পুলিশ সদস্য বা কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরাসরি অস্ত্রধারী অপরাধী, দখল-চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রক, মাদক ব্যবসা, রাজনৈতিক আশ্রয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের যোগসাজশ—সব মিলিয়ে সেখানে অপরাধের একটি সংগঠিত কাঠামো তৈরি হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, কোনো অপরাধ দৃষ্টান্তমূলকভাবে নিয়ন্ত্রণ না হলে, আইনের প্রয়োগ না হলে এবং জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা না হলে সেই অপরাধ ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে যায়। তাঁর ভাষায়, ‘বিচারহীনতা শুধু অপরাধকে টিকিয়ে রাখে না; প্রভাবশালী মহল, রাজনৈতিক শক্তি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে সেটি সংগঠিত অপরাধে রূপ নেয়।’ ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যাঁরা সরাসরি অপরাধ করেন, তাঁরা সামনে থাকেন; কিন্তু তাঁদের পেছনে থাকে সুরক্ষা, প্রশ্রয় ও লাভের একটি ব্যবস্থা। একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান ও বদলির আদেশের পরও যদি কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, সেটি শুধু ব্যক্তির দায়ের প্রশ্ন নয়; কর্তৃপক্ষের দায়ও তৈরি করে। তাঁর মতে, অপরাধীদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুরক্ষা না ভাঙলে সংগঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।



