ঈদে পাহাড়ের কোলে পরিবারের ২০ জনের অনন্য ভ্রমণগল্প
ঈদে পাহাড়ের কোলে পরিবারের ২০ জনের ভ্রমণগল্প

ঈদের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা হয়। কেউ কক্সবাজারে যান, কেউ সুন্দরবনে, কেউ দেশের বাইরে; কিন্তু এবার আমাদের পরিবারের যাত্রাটা অন্য রকম ছিল। গন্তব্য ছিল খাগড়াছড়ির বাবুছড়া— পাহাড়ের কোলে বোনের বাসা। আর সেই যাত্রায় আমরা ছিলাম মোট ২০ জন। ‘এটা শুধু বেড়ানো ছিল না। এটা ছিল একটি পুরো পরিবারের একসঙ্গে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ।’

যাত্রার শুরু

যাত্রার শুরু ঈদুল আজহার রাত ১০টায় প্রথম দলটা রওনা হলো—বাবার তিন মেয়ে আর এক ছেলে। তরুণ দল। বাসে উঠে হইহই করে বসল, যেন উৎসবটা রাস্তায়ই শুরু হয়ে গেছে। রাতের ঢাকা পেছনে ফেলে বাস ছুটল ফেনীর পথে। পরদিন রাতে রওনা হলো বড় কাফেলা। বাবা খন্দকার আহমেদুল হক, মা, বড় মেয়ে ফারজানা ও তার স্বামী, তাদের তিন বাচ্চা, বেয়াই-বেয়াইন— সবাই মিলে।

যাতায়াতের তথ্য

ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি বাসে সাধারণত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা লাগে। রাতের বাসে গেলে ভোরে পৌঁছানো যায়। ঢাকার কলাবাগান বা সায়েদাবাদ থেকে বাস নিয়মিত ছাড়ে। সমতল থেকে পাহাড়বাস যখন ফেনী পেরিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে এগোল, রাতের অন্ধকারেও টের পাওয়া যাচ্ছিল দৃশ্য বদলে যাচ্ছে। ভোর হতে হতে বারৈয়ার হাট ধরে খাগড়াছড়ির পথ। এখান থেকেই আসল রূপান্তর শুরু। সমতলের চেনা দৃশ্য সরে গিয়ে দুই পাশে পাহাড় উঁকি দিতে শুরু করল। রাস্তা বাঁক নিল। উঁচু-নিচু পথে বাস দুলল। পথের পাশ দিয়ে নেমে এলো ছোট ছোট পাহাড়ি ঝরনা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাচ্চারা ঘুম ভুলে জানালায় মুখ ঠেকিয়ে দিল। ফারজাদ: নানাভাই, পাহাড় এত বড়? এই একটি প্রশ্নই বলে দেয়—কেন শিশুদের নিয়ে পাহাড়ে আসা উচিত।

গন্তব্যে পৌঁছে

দুপুর নাগাদ পৌঁছানো গেল গন্তব্যে। গেটে দাঁড়িয়ে ছিল ফাহমিদা হক কনক, সঙ্গে শ্বশুর-শাশুড়ি। হাতে ঠান্ডা শরবত। চোখে রাত জেগে অপেক্ষার ক্লান্তি। ‘দীর্ঘ পথের ক্লান্তি সেই মুহূর্তে কোথায় উড়ে গেল।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাহাড়ি বাসায় আতিথেয়তা

একটি বাহিনীর অধিনায়কের সরকারি বাসভবন। প্রশস্ত, বাতাসময়। ২০ জন থাকার জায়গা হয়ে গেল অনায়াসে। পাহাড়ি বাসার একটি আলাদা সৌন্দর্য আছে—সকালে ঘুম ভাঙে পাখির ডাকে, জানালা খুললে চোখে পড়ে সবুজ পাহাড়ের ঢাল, রাতে নিঃশব্দতা এত গভীর যে ঝিঁঝির ডাকও স্পষ্ট শোনা যায়।

ঢাকার ফ্ল্যাটবাড়ির ঘুম আর এখানকার ঘুম এক নয়। এখানে ঘুম হয় যেন একটু বেশি গভীর— পাহাড়ের নিঃশব্দতা যেন সব শোরগোল শুষে নেয়।

২০ জনের রান্নাবান্না, ঘুমানো, আড্ডা—সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন উৎসবের হলঘর হয়ে উঠল। দুই-তিন বেয়াই-বেয়াইন মিলে আড্ডা, পুরোনো গল্প, নতুন হাসি। সকালের নাশতা থেকে রাতের খাবার— প্রতিটি বেলা ছিল একটি ছোট্ট উৎসব।

প্রথম সকাল—লিচু পাড়ার আনন্দ

পরদিন ভোরে উঠানে নামতেই চোখ আটকে গেল। বাড়ির সামনে–পেছনে কয়েকটা লিচুগাছ। থোকায় থোকায় পাকা লিচু ঝুলছে—টকটকে লাল, শিশিরে ভেজা। পাঁচ নাতি বিছানা ছেড়ে গাছতলায় জমা হয়েছে, কেউ টের পায়নি। ছোট ছোট গাছে নানান জাতের লিচু পেকেছে। পশুপাখির কবল থেকে বাঁচাতে গাছে মশারি টানানো হয়েছে। পাশেই আছে কয়েকটা দোলনা। দোলনায় দোল আর পাকা লিচু খাওয়া।

লিচু খাওয়া হলো গোল হয়ে বসে, রোদের মধ্যে। খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে গল্প। রস গড়িয়ে পড়ছে চিবুকে। কেউ মুছছে না, কেউ তাড়া করছে না। পাহাড়ি বাড়িতে এই এক সুবিধা—ফলের গাছ আছে, সময় আছে, তাড়া নেই।

দুপুরে এলো কাঁচা আম—লবণ-মরিচ-শর্ষের তেলে মাখা। বারান্দায় বসে আমের আসর জমল। দুই বেয়াই মুখোমুখি বসে গল্পে ডুবলেন। ভেতর থেকে ভাত ঠান্ডা হওয়ার হাঁক এলো—কেউ কান দিলেন না।

পুকুরে গোসল—ভ্রমণের সেরা মুহূর্ত

দুপুরে পুকুরে নামল দল। পাহাড়ি বাড়িতে পুকুর থাকলে সেটি এক বাড়তি পাওনা। এই পুকুরের পানি স্বচ্ছ, ঠান্ডা—ঢাকার গরম গায়ে লাগলে মনে হবে বরফ ছুঁয়েছে। পুকুরে তখন রীতিমতো হইচই। দুই বোন পাড়ে বসে দেখছিল। হাসতে হাসতে চোখ ভিজে আসছিল।

ভ্রমণ পরামর্শ: পাহাড়ি বাড়িতে পুকুর বা প্রাকৃতিক জলাশয় থাকলে বিকেলের এই সময়টা সবচেয়ে সুন্দর কাটে। বাচ্চাদের জন্য এটা অমূল্য অভিজ্ঞতা—ঢাকার কংক্রিটের শহরে যা পাওয়া সম্ভব নয়।

জারুলছড়া—যেখানে কথা থামে

পরদিন বিকেলে তিনটি গাড়িতে বের হলাম সূর্যাস্ত দেখতে। পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানো একটি অভিজ্ঞতা। বাঁকে বাঁকে নতুন দৃশ্য খুলে যায়। কোথাও পাহাড় কেটে রাস্তা, কোথাও নিচে গভীর খাদ, কোথাও ঝরনার শব্দ। জারুলছড়া হেলিপ্যাডে পৌঁছে সামনে যা দেখলাম, তা ভাষায় বলা কঠিন। পাহাড়ের পর পাহাড়। স্তরে স্তরে সবুজ। দূরের চূড়ায় মেঘ বসে আছে যেন ঘরের মতো। বাতাসে একটি শীতল স্পর্শ—ঢাকার ভ্যাপসা গরম যেন কখনো ছিলই না।

ফারজাদ: নানাভাই, এইখানে হেলিকপ্টার নামে? ফাইয়াদ: তুমি বড় হলে তুমিও চালাবে। ছেলেটা সিরিয়াস মুখে মাথা নাড়ল। হেলিপ্যাডের সমতল মাঠে সবাই ছড়িয়ে পড়লাম। কেউ দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড় দেখছে, কেউ ঘাসে বসে পড়েছে, বাচ্চারা ছুটছে খোলা মাঠে।

জান্নাতুল ফেরদৌস কলি একা দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখছিলেন। চুপ করে। চোখে একটি অদ্ভুত শান্তি। সারা জীবন সংসারের চার দেয়ালে কাটিয়েছেন। পাহাড় দেখার সুযোগ হয়নি। আজ হলো। ফাহমিদা মায়ের হাত ধরল। কোনো কথা হলো না। কিছু মুহূর্ত কথার বাইরে।

দীঘিনালার বিকেল—গানের সুর

বিকেলে গেলাম দীঘিনালার পাহাড়ি এলাকায়। ঘন সবুজ অরণ্য, পাহাড়ি ছড়া, আদিবাসী জনপদ— পার্বত্য চট্টগ্রামের এই অংশটি অন্য রকম শান্ত। পাহাড়ের একটি ঢালে গাড়ি থামল। নামলাম সবাই। বাতাসে পাহাড়ি গাছের ঘ্রাণ। দূর থেকে পাখির ডাক।

হঠাৎ ফারজানা হক বীথি গান ধরল। পুরোনো বাংলা গান। বেয়াইন প্রথমে চুপ করে শুনলেন। তারপর সুর মেলালেন। সবাই: আম্মা, তুমি এত সুন্দর গাও? আম্মা: তোমাদের জন্মানোর আগেও গান গাইতাম।

পাহাড়ের গায়ে বিকেলের রোদ কমে আসছিল। আকাশে কমলা আর সোনালির মিশেল। সেই আলোয় ২০ জন পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে। খন্দকার সাহেব একটু সরে গিয়ে একটা পাথরে বসলেন। সামনে পাহাড়ের অসীম বিস্তার। পেছনে তাঁর সেই মানুষেরা। মেজ মেয়ে এসে মাথা রাখল বাবার কাঁধে। মেয়ে: আব্বা, ভালো লাগছে? আব্বা: এইটুকুই চাই রে মা। সারা জীবন এইটুকুই চেয়েছিলাম।

শেষ রাত—দস্তরখানার আড্ডা

রাতে ভবনের ছাদে বড় দস্তরখানা পাতা হলো। ২০ জন একসঙ্গে বসে খেল। গোল হয়ে। কনুই ঠেকাঠেকি করে। রান্না বেশি হয়েছিল, খাওয়াও বেশি হলো। মাহদি বলল, ‘এই রান্নার কোনো তুলনা নেই।’ সাইফান, শাফরিন, ফাতিহা, সানজিদা, ফাইজা, সিফাত, নয়ন, বীথি, সালেহ সাহেব, পারভীন—সবাই মিলে কারাওকেতে বাংলা গান গাইল। পূর্ণিমা রাত।

আড্ডা চলল রাত একটা পর্যন্ত। গান হলো। পুরোনো স্মৃতি উঠে এলো। কেউ হাসল, কেউ চোখ মুছল। তারপর একে একে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল—পাহাড়ের নিঃশব্দতার কোলে।

ভোরের বিদায়

শেষ রাতে খন্দকার সাহেব একবার বারান্দায় এলেন। বাইরে পাহাড়ি অন্ধকার। আকাশভরা তারা। ঝিঁঝি ডাকছে। ভেতরে ২০ জন মানুষের ঘুমের নিশ্বাস। এসব মানুষ কাল ফিরে যাবে যার যার জীবনে—ঢাকার ব্যস্ততায়, অফিসের চাপে, সংসারের জটিলতায়; কিন্তু বাবুছড়ার এই কটা দিন মুছবে না। ‘লিচু পাড়ার সকাল, পুকুরের হাসি, হেলিপ্যাডে দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখা, দীঘিনালার বিকেলের গান, উঠোনের দস্তরখান—এগুলো স্মৃতির সেই ভাঁজে থাকে, যেখানে সময় পৌঁছায় না।’

যাঁরা যেতে চান

খাগড়াছড়ি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি জেলা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আদিবাসী সংস্কৃতি আর পাহাড়ি জীবনযাত্রার অনন্য সমন্বয়—পারিবারিক ভ্রমণের জন্য এটি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা গন্তব্য।

ভ্রমণ পরামর্শ

  • ঈদ বা যেকোনো ছুটিতে আসতে চাইলে আগে থেকে পরিকল্পনা করুন।
  • রাতের বাসে আসুন—ভোরে পৌঁছে সারা দিন পাবেন।
  • বাচ্চাদের নিয়ে আসতে ভয় নেই। পাহাড়, ঝরনা, খোলা আকাশ তাদের মনে যে ছাপ ফেলবে, তা সারা জীবন থাকবে।
  • পরিবারের বড়দের নিয়ে আসুন। যিনি সারা জীবন সংসার সামলেছেন, তাঁকে একবার পাহাড় দেখান।