ছোটবেলা থেকে ফুফুকে মা বলে ডাকতাম। মা আমাকে পৃথিবীর মুখ দেখিয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাকে নানাবাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আমার দেখাশোনা, লালন–পালন ফুফুমা আর দাদু করতেন। ফুফুকে মা বলে ডাকতাম। বাবা তখন কক্সবাজার জেলার সরকারি কৃষি কর্মকর্তা। মা-বিহীন শিশুকাল কেমন কেটেছে, মাঝেমধ্যে মনের ক্যানভাসে ছবি এঁকে তা কল্পনা করি। মা দেখতে কেমন, ছোটবেলায় মায়েরা তাঁর সন্তানদের কেমন করে কপালে চুমো এঁকে দেন; কত যত্ন, আদর-স্নেহ, ভালোবাসা–মায়ায় বড় করেন। দুষ্টুমি করলে শাসন করা, মধুর বকা, নিজে না খেয়ে সন্তানকে খাওয়ান মা। অসুস্থ হলে রাতদুপুরে সন্তানের শিয়রে বসে অস্থির হওয়া। শিশুকালের মায়ের আদরটা বড্ড বেশি মিস করেছি।
আগন্তুকের মতো ফিরে আসা মা
বয়স তখন চার–পাঁচ বছর। হঠাৎ একদিন আগন্তুকের মতো মলিন চেহারার এক অপরিচিত ভদ্রমহিলা এসে শক্ত করে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে অঝোরে কাঁদছিল। বুকে নিয়ে কপালে চুমো এঁকে দিচ্ছে। বলছে, ‘আমার কলিজার টুকরো, আমার মানিক।’ ফুফুমা এসে বলল, ‘তোর আম্মু, এটাই তোর আসল মা।’ আমি বললাম, ‘আমার দুটো মা কীভাবে? তুমি আমার মা।’
কিছুটা অভিমান হলো মায়ের ওপর। একেবারে মা পাখিটার সঙ্গে সদ্য উড়তে শেখা অভিমানী পাখির ছানার মতো। লজ্জায় সিঁদুরে পাকা আমের মতো মুখ লাল হয়ে গেল। আমাকে ছাড়া মা কীভাবে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিল তার বাবার বাড়িতে।
মায়ের না-বলা গল্প
অতঃপর একদিন মায়ের মুখে শুনলাম তার না–বলা গল্প। দাদুবাড়িতে শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছিল মা। সেই থেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে। মায়ের গল্প শুনে মনে হলো বুকে কেউ যেন ধারালো চাকু দিয়ে পোঁচিয়ে পোঁচিয়ে আঘাত করছে, কাঠঠোকরা পাখি গাছে যেভাবে আঘাত করে ঠিক সে রকম। মা কত না কষ্ট পেয়েছিল। অসুস্থ শরীর নিয়ে তার সন্তানকে দেখতে আসত। ফুফুমা–দাদুরা আমাকে লুকিয়ে রাখতেন। মায়ের কাছে যেতে দিতেন না। মা যদি আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। একদিন নাকি মা এসেছিল আমাকে নিয়ে যেতে। ঘরের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো। সারা রাত দরজার বাইরে নির্ঘুম কাটিয়ে দেয় মা।
পরদিন সকালে কাঁদতে কাঁদতে নানাবাড়িতে ফিরে গেল। দীর্ঘ চার বছর পর মায়ের প্রত্যাবর্তন। সন্ধ্যাবেলায় মা হারিকেন জ্বালিয়ে পড়াত। মায়ের কাছে পড়ালেখার হাতেখড়ি। চক-পেনসিল দিয়ে স্লেটে লেখা শেখা থেকে শুরু করে কবিতা, ছড়া, রূপকথার গল্প বলা—সবকিছু মায়ের কাছে। মা সব সময় বলত, মানুষের উপকার করবে। পড়ালেখা করে যেন ভালো মানুষ হই। মা ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। রাতের বেলা কত যত্ন করে মশারি টাঙিয়ে কাঁথা জড়িয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিত।
মায়ের মধুর কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত
ভোরবেলা মায়ের মধুর কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত শুনে ঘুম ভাঙত। মা খুব আদর করে ঘুম থেকে ডেকে মাথায় ফুঁ দিয়ে দোয়া করে বলত, ‘আল্লাহ আমার ছেলেকে বিদ্যাবুদ্ধি দান করো, মানুষের মতো মানুষ করো, মওলা আমার কলিজার টুকরোকে তুমি রহম করো, বিপদ-আপদ থেকে শেফা দান করো।’
মা হেঁশেলঘরে গিয়ে মাটির চুলায় রান্না করত। মাঝেমধ্যে চুলায় আগুন নিভে যেত, তখন বাঁশের চুঙ্গিতে ফুঁ দিয়ে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করত। শুভ্র ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়ে যেত, মা খুকখুক করে কাশত।
মায়ের চোখের কোণে অশ্রু। ডাক দিয়ে বলত, ‘হেঁশেলে এসো না বাবা, চোখ জ্বলবে।’ হেঁশেলের এ দৃশ্য আজও চোখের সামনে জলছবির মতো ভেসে ওঠে।
বাদলা দিনে মায়ের কষ্ট
আমাদের টিনের চালা মাটির ঘর। বাদলা দিনে টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দকে মনে হতো কেউ নূপুর পরে নৃত্য করছে। মাঝেমধ্যে ঘরের টিনের ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ত, মা নিচে হাঁড়ি–পাতিল বসিয়ে দিত। বৃষ্টিতে তার কষ্ট বেড়ে যেত। সন্ধ্যাবেলা নারকেল আর চালভাজা খেতে দিত, সঙ্গে নাড়ু থাকত।
প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের রাত
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল, সন্ধ্যা থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। ব্যাটারিচালিত রেডিওতে খবরে বলা হয়েছে—‘১০ নম্বর মহা বিপৎসংকেত’, জলোচ্ছ্বাস হবে। রাতে আকাশ জাঁকিয়ে বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়ার তাণ্ডব শুরু হলো। খিড়কির ফাঁক দিয়ে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যাচ্ছে। এমন ঝড় জীবনে দেখিনি, ঝড়ের সঙ্গে যেন আগুনের লেলিহান শিখা। ঘরের চাল ঘেঁষে বর্ষীয়ান আম, কাঁঠাল, জামগাছ আছড়ে পড়েছে। মনে হচ্ছিল ঝড় পুরো ঘর তুলে নিয়ে যাবে। ছোট ভাই মামুন ভয় পেয়ে কেঁদে উঠছে। মা আয়াতুল কুরসি পড়ে ফুঁ দিচ্ছে। মা আমাদের বুকে জড়িয়ে আগলে রাখে। কবুতরের খোপে মা কবুতর যেভাবে পাখনা দিয়ে তার ছানাগুলোকে বুকে আগলে রাখে ঠিক সেভাবে।
কখন যে ঘুম এল টের পাইনি। পরদিন সকালে মা জানাল, প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় হয়েছে, সমুদ্র উপকূলে অনেক লোক মারা গেছে। মা সারা রাত জেগে ছিল। বাবা কক্সবাজারে, তাঁর জন্য চিন্তা করছিল। মা শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে। জানাল, গাছ পড়ে হেঁশেল ভেঙে গেছে। হেঁশেলে পানি। মা হেঁশেলে গিয়ে ডুকরে ডুকরে কেঁদে বলছে, ‘আল্লাহ, আমার সন্তানদের কী খাওয়াব?’ বাড়ির উঠানে হাঁটুসমান বানের পানি প্রবেশ করেছে। ঘরের দাওয়া পানিতে টইটম্বুর। বেলা দুইটায় নানাবাড়ি থেকে ভ্যানগাড়ি করে টিফিন ক্যারিয়ার ও হাঁড়ি–পাতিল বোঝাই করে নানু খাবার পাঠালেন। মায়ের চোখে আনন্দের অশ্রু বয়ে গেল।
মায়ের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী
মা জানো, হেঁশেলে তোমার গড়িয়ে পড়া অশ্রুতে আজও আমার নয়ন জলে ভাসে। তুমি ছাড়া আমার সবকিছু থমকে গেছে। তোমার সাড়ে তিন হাত মাটির কুঁড়েঘরের চারপাশে তোমার পছন্দের কামিনী, শিউলি, হাসনাহেনা, দূর্বাঘাস লাগিয়েছি, সেখানে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। তোমার এত তাড়া ছিল কেন মা? তুমি ছিলে আমাদের বাগানের অলিন্দে ফোটা নীলপদ্ম। মা, তোমার দোয়ার বৃষ্টি খুব মিস করি! জান্নাতের বাগান থেকে যেন তোমার দোয়ার বৃষ্টি আমার ওপর প্রতিনিয়ত বর্ষিত হয়।
আজ মায়ের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। খুব জানতে ইচ্ছা করে শতবর্ষী রেইনট্রির নিচে তুমি কেমন আছ? পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি—তিনি যেন তোমাকে জান্নাতের বাগানের ফুল হিসেবে যত্নে রাখেন।



