জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথম আলোর আক্রান্ত ভবনে 'আলো' প্রদর্শনী দেখলেন
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথম আলোর প্রদর্শনী দেখলেন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথম আলোর আক্রান্ত ভবনে 'আলো' প্রদর্শনী দেখলেন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত প্রথম আলোর আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ ভবন পরিদর্শন করেছেন। তারা সেখানে চলমান শিল্প–আয়োজন 'আলো' প্রদর্শনী দেখতে আসেন, যা ভবনের ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি শিল্পকর্ম নিয়ে সাজানো হয়েছে। এই বিভাগের প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থী এই বিশেষ অভিজ্ঞতা লাভ করতে সেখানে উপস্থিত হন।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ

শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরা তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, 'পুড়ে যাওয়া ভবন দেখে বোঝা যাচ্ছে, এই হামলা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপের চেষ্টা। আমরা সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে বুঝতে পারি, গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটা জরুরি।' তিনি আরও উল্লেখ করেন যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে তরুণ শিক্ষার্থীরা এই পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হবেন। খাদিজাতুল কুবরা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, 'দুঃখজনক হলো এখনো এই ঘটনার কোনো বিচার হয়নি। সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী হিসেবে এই অবস্থা আমাদের জন্য আতঙ্কের। নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে।'

শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্দেশ্য

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মিঠুন মিয়া ব্যাখ্যা করেন যে তিনি শিক্ষার্থীদের গণমাধ্যমকে দমিয়ে রাখার চেষ্টার বাস্তব উদাহরণ দেখাতেই এই ভবনে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, 'যারা আক্রমণ করেছে, তারাই এখন জাতির কাছে নিকৃষ্ট বলে প্রমাণিত হয়েছে। আলোকে কখনো নেভানো যায় না। বরং যারা আক্রমণ করেছে, তারা আলোর ক্ষমতা সম্পর্কে জানে না বলেই এমনটি করেছে। আমাদের প্রত্যাশা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হোক। প্রথম আলো পুরোদমে কাজ করুক।'

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ ও প্রতিক্রিয়া

এই দিনে প্রদর্শনী দেখতে বেসরকারি ইউসিএসআই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের একদল শিক্ষার্থীও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন প্রভাষক আহমেদ বিন কাদের, যিনি বলেন, 'শিক্ষার্থীদের দেখাতে চেয়েছি যে বাংলাদেশে প্রথম সারির গণমাধ্যমটি কতটা জঘন্য আক্রমণের শিকার হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দেখা উচিত, বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটা করুণ।' ইউসিএসআই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবিদা আফসারা গোলন্দাজ তাঁর মন্তব্যে যোগ করেন, 'এ প্রদর্শনীটা একটা তীব্র যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি দেয়। আমার ভাবতে খারাপ লাগছে, যেদিন আগুন দেওয়া হয়েছিল, সেদিন ভবনের ভেতরে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের প্রাণ কতটা হুমকিতে ছিল।' তিনি আরও বলেন যে প্রথম আলোকে দমিয়ে রাখা যায়নি এবং সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী হিসেবে এই হামলা ভয় সৃষ্টি করলেও প্রথম আলোর চলমান কাজ সেই ভয় দূর করেছে।

কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের বক্তব্য

প্রদর্শনী শেষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন যে প্রথম আলোতে হামলার সময় দায়িত্বে থাকা সরকার হামলা ঠেকাতে পারত, কারণ তাদের কাছে সম্পর্কিত তথ্য ছিল, কিন্তু তারা তা করেনি। আনিসুল হক আরও বলেন, 'প্রথম আলোর অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু হামলার পর এই প্রদর্শনী প্রথম আলোকে শক্তি জুগিয়েছে। তাই হামলার পরও আমরা সত্য সাংবাদিকতা করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কারণ, সত্যই আমাদের সাহস।'

প্রদর্শনীর সময়সূচি ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি

এই 'আলো' প্রদর্শনীটি গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে ১টা এবং বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। আজকের দিনে বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত প্রদর্শনী দেখতে শতাধিক দর্শনার্থী আসেন, যাঁদের মধ্যে অনেকেই পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে শিল্পকর্মগুলো ঘুরে দেখেছেন। দর্শনার্থীরা উল্লেখ করেন যে আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবনের ভিডিও দেখেও যে ভয়াবহতা পুরোপুরি বুঝতে পারেননি, এই প্রদর্শনী তা নতুন করে অনুভব করিয়েছে।

হামলার পটভূমি

উল্লেখ্য, গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে একদল উগ্রবাদী প্রথম আলো ভবনে হামলা চালিয়ে ব্যাপক লুটপাট করে এবং পরে ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই অগ্নিদগ্ধ ভবনেই বিশিষ্ট শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের 'আলো' প্রদর্শনী আয়োজিত হচ্ছে, যা ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি শিল্পকর্মের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করছে। এই ঘটনা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার সূত্রপাত করেছে।