সংবিধান না মানার অভিযোগে বিরোধী দলের 'দ্বিচারিতা' ও 'আইনি অজ্ঞতা'র তীব্র সমালোচনা আইনমন্ত্রীর
১৯৭২ সালের সংবিধান না মানার ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও একই সংবিধানের আলোকে শপথ নিয়ে সংসদে আসা বিরোধী দলীয় সদস্যদের অবস্থানকে 'দ্বিচারিতা' ও 'আইনি অজ্ঞতা' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) জাতীয় সংসদে 'জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫' শীর্ষক নির্ধারিত আলোচনার জবাবে তিনি এ অভিযোগ তোলেন।
স্ববিরোধী অবস্থানের কঠোর সমালোচনা
আইনমন্ত্রী বলেন, "বিরোধী দলের মাননীয় সদস্যরা জানেনই না উনারা কিসের ওপরে আন্দোলন বা বক্তব্য রাখছেন। উনারা বলছেন, সংবিধান মানেন না, অথচ আজ ১০ ধারার প্রশ্নের প্রথম কথাই বলা আছে সাংবিধানিক পদ্ধতির কথা। একদিকে বলবেন ৭২-এর সংবিধান মানবেন না, আরেকদিকে সুযোগ নেবেন সাংবিধানিক পদ্ধতির—এটি স্ববিরোধীতা।" তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিরোধী দল সংবিধান নিয়ে বিভ্রান্তিকর অবস্থান নিচ্ছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।
১৯৭২ সালের সংবিধান ও জুলাই বিপ্লবের ম্যান্ডেট
আসাদুজ্জামান স্পষ্ট করেন যে বর্তমান সরকারের যাবতীয় কার্যক্রমের ভিত্তি হলো ১৯৭২ সালের সংবিধান এবং ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের ম্যান্ডেট। তিনি বলেন, "আমাদের বুঝতে হবে ৭২-এর সংবিধান আমাদের কাছে বেসিস (ভিত্তি)। ২৪-এর জুলাই বিপ্লব উত্তর সময়ে জনগণ আমাদের এই ম্যান্ডেট দিয়েছে। এই সংবিধানকে সামনে রেখেই আমরা প্রয়োজনীয় সংশোধনী ও সংস্কার আনবো।"
জুলাই সনদকে কার্যকর করার জন্য 'জুলাই আদেশ' এবং 'গণভোট অধ্যাদেশ' জারি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, জুলাই সনদের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে সংবিধান সংশোধনের স্পষ্ট রূপরেখা দেওয়া আছে এবং সরকার সংবিধান সংশোধন করতে দায়বদ্ধ।
বিরোধী দলের চর্চা নিয়ে প্রশ্ন
আইনমন্ত্রী বিএনপির নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, "আমরা যারা বিএনপি করি, আমরা জুলাই বিপ্লবীদের মতো আবেগী এবং জন-আকাঙ্ক্ষার কথা চিন্তা করি।" তবে তিনি বিরোধী দলের বর্তমান অবস্থান নিয়ে কঠোর ভাষায় প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, "জুলাই সনদের ২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচনে পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিএনপি সেই চেতনা ধারণ করে পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী দিয়েছিল। কিন্তু, যারা জুলাই সনদ নিয়ে মুখে ফেনা তুলছেন, তারা একজন নারী প্রতিনিধিকেও মনোনয়ন দেয়নি।"
সংসদীয় গণতন্ত্র ও বিরোধী দলের ভূমিকা
সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য রক্ষায় জুলাই সনদের ২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, "আমাদের সংসদীয় দলের নেতা জুলাই সনদকে হৃদয়ে ধারণ করেন বলেই বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদের অফার দিয়েছিলেন। কিন্তু উনারা তা গ্রহণ করেননি।"
বিরোধী দলের আইনি ব্যাখ্যার সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, "জেনারেল ক্লজেজ অ্যাক্ট এবং সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এই সংসদ সার্বভৌম। কোনও আদেশ দিয়ে এই সংসদকে বাধ্য করা যায় না।"
সংবিধান সংস্কার ও বিশেষ কমিটি প্রস্তাব
সংসদীয় গণতন্ত্র সুসংহত করতে এবং সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাবিত 'বিশেষ সংসদীয় কমিটি' গঠনের প্রতি সমর্থন জানান আইনমন্ত্রী। তবে, বিরোধী দলের ৫০-৫০ সদস্য সংখ্যার দাবিকে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, "বিচার মানেই তালগাছ আমার—এমন নীতি চলবে না। ২১৯ জন সদস্যের বিপরীতে ৭৭ জন সদস্য সমান প্রতিনিধিত্ব চাইলে তা হবে বৈষম্য।"
নেতৃত্বের প্রশংসা ও নতুন বাংলাদেশের আহ্বান
আইনমন্ত্রী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, "বাংলাদেশের যা কিছু শ্রেষ্ঠ অর্জন তা এই পরিবারের হাত ধরেই এসেছে।" জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও যোদ্ধাদের ঋণের কথা স্মরণ করে তিনি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান।
আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্য জাতীয় সংসদে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করে এবং বিরোধী দলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয় এই আলোচনায়।



