নেপালে রাজতন্ত্রপন্থিদের বড় সমাবেশ, নতুন নির্বাচনে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে
নেপালে রাজতন্ত্রপন্থিদের সমাবেশ, নতুন নির্বাচনে অস্থিরতা

নেপালে রাজতন্ত্রপন্থিদের বড় সমাবেশ এবং নতুন নির্বাচনের প্রস্তুতি

গত সেপ্টেম্বর মাসে জেন-জি তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভে ৭৭ জন নাগরিক নিহত হন, যা দেশটিতে ব্যাপক রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এই আন্দোলনের চাপে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, যার ফলে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে আগামী ৫ মার্চ নতুন সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে, যা দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্রের সমর্থনে রাজতন্ত্রপন্থিদের সমাবেশ

শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে রাজধানী কাঠমান্ডুতে হাজারো সমর্থক সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্রকে স্বাগত জানাতে ভিড় জমান। তিনি তিন মাস পর দেশে ফিরে আসায় এই সমাবেশটি বিশেষভাবে লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। বিমানবন্দর থেকে তার ব্যক্তিগত বাসভবনে ফেরার পথে গাড়িটি ঘিরে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। এ সময় ‘রাজা ফিরে আসুন, দেশকে বাঁচান’ স্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। উপস্থিত জনতা জাতীয় পতাকা নেড়ে এবং ফুলের তোড়া দিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান, যা রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করে।

২০০৮ সালে সাবেক মাওবাদী বিদ্রোহীদের প্রভাবাধীন একটি বিশেষ আইনসভা নেপালের রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে দেশটিকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করে। এরপর থেকে ৭৮ বছর বয়সী জ্ঞানেন্দ্র সাধারণ নাগরিক হিসেবে কাঠমান্ডুর ব্যক্তিগত বাসভবনে বসবাস করছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজতন্ত্রপন্থিদের সমর্থন বাড়তে দেখা গেছে, যা বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের হতাশার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক প্রভাব

গত ১৮ বছরে নেপালে ১৪ বার সরকার পরিবর্তন হয়েছে, যা দেশটিতে ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থিরতার চিত্র তুলে ধরে। এই অস্থিরতার ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নড়বড়ে হয়েছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়েছে। ৫৫ বছর বয়সী সমর্থক সনাতন প্রসাদ রেগমি বলেন, ‘রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, কারণ একমাত্র রাজাই পুরো নেপালি জনগণের অভিভাবক হতে পারেন। বহু দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতা সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।’ তার মতে, প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি, যা তরুণ প্রজন্মসহ অনেক নেপালির হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নতুন সংসদ নির্বাচন এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা

আগামী ৫ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য নতুন সংসদ নির্বাচনে ২৭৫টি আসনে মোট ৬৫টি রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, যার মধ্যে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকা একটি দলও অন্তর্ভুক্ত। এই নির্বাচনে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী পুরোনো দলগুলোর বিপরীতে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন দুই জনপ্রিয় নেতা:

  • বালেন্দ্র শাহ: যিনি র‍্যাপার থেকে কাঠমান্ডুর মেয়র হয়েছেন এবং তার জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়ছে।
  • রবি লামিছানে: সাবেক টিভি উপস্থাপক থেকে রাজনীতিতে আসা এই নেতা তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিশেষভাবে সমাদৃত।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, প্রায় ৩ কোটি জনসংখ্যার দেশ নেপালে এবার প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পর নতুন করে প্রায় ১০ লাখ ভোটার যুক্ত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই তরুণ প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত। এই তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ নির্বাচনের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করেছেন।

নেপালের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং অনিশ্চিত। নতুন নির্বাচন দেশটির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, তবে রাজতন্ত্রপন্থিদের ক্রমবর্ধমান সমর্থন এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা সরকারের জন্য বড় একটি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।