কুমিল্লা-৭ আসনে শাওনের জয়: সাংগঠনিক শক্তির কাছে রেদোয়ানের ভরাডুবি
কুমিল্লা-৭: শাওনের সাংগঠনিক শক্তিতে রেদোয়ানের পরাজয়

কুমিল্লা-৭ আসনে শাওনের ঐতিহাসিক বিজয়: সাংগঠনিক শক্তির প্রভাব

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৭ চান্দিনা সংসদীয় আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ড. রেদোয়ান আহমেদের ভরাডুবির নেপথ্যে রয়েছে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আতিকুল আলম শাওনের সুদৃঢ় সাংগঠনিক শক্তি। গত ২৭ বছর ধরে শাওন চান্দিনায় বিএনপি এবং এর সকল অঙ্গসংগঠনকে নিজ হাতে সাজিয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি কাঠামো গড়ে তুলেছেন।

সাংগঠনিক শক্তির পার্থক্য

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ড. রেদোয়ান আহমেদ তার নিজ সংগঠন এলডিপিকে সাংগঠনিকভাবে সমৃদ্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় নির্বাচনে ধরাশায়ী হয়েছেন। অন্যদিকে, আতিকুল আলম শাওন গত ১৭ বছর ধরে কুমিল্লার চান্দিনায় বিএনপির একমাত্র কান্ডারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ওয়ার্ড থেকে উপজেলা পর্যন্ত বিএনপি এবং এর সকল অঙ্গসংগঠনের শক্তিশালী কমিটি গঠন করেছেন এবং এলাকায় অবস্থান করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর এলডিপি নেতাকর্মীরা এলাকায় বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, মামলা বাণিজ্য, দখলবাজিসহ নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে পৌর এলাকার কয়েকটি পরিবার ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করেন। এদিকে, ৫ আগস্টের পর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আতিকুল আলম শাওন একেবারেই শান্ত ছিলেন এবং তিনি ও তার অনুসারীরা মামলা বা হামলায় জড়াননি।

নির্বাচনী ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া

ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, আতিকুল আলম শাওন বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘কলস’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৯১ হাজার ৬৯০ ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে, ড. রেদোয়ান আহমেদ ৪৮ হাজার ৫০৯ ভোট পেয়েছেন। শাওন ৪৩ হাজার ১৮১ ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন।

নব নির্বাচিত সংসদ সদস্য আতিকুল আলম শাওন বলেন, "নেতাকর্মীদের দাবির প্রেক্ষিতে নির্বাচন করেছি। তৃণমূল নেতাকর্মীরা আমার বিজয় নিশ্চিত করেছেন। গত ১৭ বছর আমি বিএনপির কান্ডারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি এবং ওয়ার্ড লেভেল থেকে দলকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করেছি। রেদোয়ান সাহেব হঠাৎ এসেই এমপি হওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়।"

এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী ড. রেদোয়ান আহমেদ মন্তব্য করেন, "প্রশাসন আমার বিরোধিতা করেছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা থাকার পরও বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মী আমার বিপক্ষে কাজ করেছে। আমি ভোটে হারলেও মাঠে থাকব এবং দলকে শক্তিশালী করব।"

পটভূমি ও সমর্থনের বলয়

শাওন ২০১৮ সাল থেকে চান্দিনা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ৩ দিন আগে হঠাৎ দল পরিবর্তন করে বিএনপিতে যোগদান করেন রেদোয়ান আহমেদ। তিনি বিএনপিতে যোগদানের সঙ্গে সঙ্গেই দলীয় মনোনয়নপত্র পান। পরবর্তীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েই নির্বাচনে অংশ নিতে হয় শাওনকে এবং প্রার্থী হওয়ার কারণে দলীয় পদও হারান তিনি।

শাওনের বিজয়ের নেপথ্যে রয়েছে তার বাবা মরহুম খোরশেদ আলম ও তার নিজ হাতে গড়া উপজেলা বিএনপি থেকে শুরু করে ওয়ার্ড কমিটির নেতাকর্মীদের পূর্ণ সমর্থন। দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পরও কোনো নেতাকর্মী তাকে ছেড়ে যায়নি। সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় চারবারের সাবেক সংসদ সদস্যকে ধরাশায়ী করে বিজয় নিশ্চিত করেছেন আতিকুল আলম শাওন।

কুমিল্লা-৭ আসন থেকে হঠাৎ রেদোয়ান আহমেদকে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়ায় তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীরা মেনে নেয়নি। বহিষ্কার হলেও তারা শাওনের পক্ষে মাঠে নামেন, যা রেদোয়ানের জন্য কোনো সুবিধা বয়ে আনতে পারেনি। স্থানীয় জনসাধারণের বিপুল সমর্থনই শাওনের এই চমকপ্রদ বিজয়ের মূল চাবিকাঠি বলে মনে করা হচ্ছে।