ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়, জামানত হারালেন শতাধিক প্রার্থী
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়, জামানত হারালেন শতাধিক

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিশাল বিজয়, জামানত হারালেন শতাধিক প্রার্থী

প্রায় দুই যুগ পর সরকার গঠনের পথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন জয় করে দলটি এবার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি ও তার মিত্ররা পেয়েছে ২১২টি আসন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য পেয়েছে ৭৭ আসন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি এবং স্বতন্ত্ররা পেয়েছে সাতটি আসন।

বিএনপির বিজয়ে জামানত হারালেন শতাধিক প্রার্থী

বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ের মধ্য দিয়ে একেক আসনে চার-পাঁচ জন করে প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন। দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি জামানত হারিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন ও জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থীরা। গাইবান্ধা জেলাতেই জাতীয় পার্টি মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীসহ ২৬ জন প্রার্থী তাদের জামানত হারিয়েছেন। গাইবান্ধা-৫ আসনে লাঙ্গল প্রতীকে মাত্র ৩ হাজার ৩৭৫ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন শামীম হায়দার পাটোয়ারী, যেখানে জামানত রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল ২৬ হাজার ৬৫৬ ভোট।

বিভিন্ন জেলায় জামানত বাজেয়াপ্তের চিত্র

চট্টগ্রামে ১৪টি আসনের ৯৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫৯ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে, যা প্রার্থীদের ৬০ শতাংশ। কুমিল্লায় ১১টি আসনের ৮৩ প্রার্থীর মধ্যে ৫৭ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কোনও প্রার্থীই জামানত ফেরত পাচ্ছেন না। খাগড়াছড়ির একমাত্র সংসদীয় আসনে ১১ জন প্রার্থীর মধ্যে সাত জনের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

খুলনায় ছয়টি আসনে ৩৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৬ জন জামানত হারিয়েছেন। যশোরে ছয়টি আসনের ৩৭ প্রার্থীর মধ্যে ২৪ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে, জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি ছাড়া সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা জামানত হারিয়েছেন। বাগেরহাটে চারটি আসনের ২৩ প্রার্থীর মধ্যে ১৪ জন জামানত হারিয়েছেন।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের জামানত হারানো

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম মাত্র ১ হাজার ৭১৯ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন। তিনি ১৯৮৮ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০১৪ ও ২০১৮ সালে টানা দুইবার এমপি নির্বাচিত হন। সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এই জাপা নেতা।

ঠাকুরগাঁওয়ে সাবেক দুই সংসদ সদস্যসহ ১৪ প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন। জামালপুরের পাঁচটি আসনে ৩৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৪ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। সিরাজগঞ্জের ছয়টি আসনে ৩৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৭ জন জামানত হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৫ জনের প্রাপ্ত ভোট চার অঙ্কের ঘরেও পৌঁছায়নি।

অন্যান্য জেলার পরিসংখ্যান

  • মাদারীপুরে তিনটি আসনের ২৫ প্রার্থীর মধ্যে ১৭ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত
  • রাজশাহীতে ছয়টি আসনের ৩২ প্রার্থীর মধ্যে ২০ জন জামানত হারিয়েছেন
  • সিলেটে ছয়টি আসনের ৩৩ প্রার্থীর মধ্যে ২০ জন জামানত হারিয়েছেন
  • বরিশালে ছয়টি আসনের ৩৬ প্রার্থীর মধ্যে ২১ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত

নারী প্রার্থীদের অবস্থা

রংপুর বিভাগের আট জেলার ৩৩টি আসনে লড়েছেন ৯ নারী প্রার্থী, যাদের মধ্যে চারজন ছিলেন স্বতন্ত্র। ভোটের লড়াইয়ে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় প্রত্যেকেই জামানত হারিয়েছেন। নারী প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন ২ হাজার ৮৭৬ এবং সর্বনিম্ন ১৫৩ ভোট।

জামানত বাজেয়াপ্তের নিয়ম

নির্বাচনি আইন অনুযায়ী, কোনও প্রার্থীর জামানত রক্ষার জন্য মোট বৈধ ভোটের অন্তত আট ভাগের এক ভাগ বা ১২.৫ শতাংশ ভোট পাওয়া প্রয়োজন। গাইবান্ধা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম জানান, কাস্টিং ভোটের শতকরা সাড়ে ১২ শতাংশ ভোট না পেলে সেই প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত করে সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা করা হয়। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, গণ প্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ৪১ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও আসনে প্রদত্ত ভোটের এক অষ্টমাংশ কোনও প্রার্থী না পেলে তার নির্বাচনি জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।

এবারের নির্বাচনে বিএনপির বিশাল বিজয়ের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় শতাধিক প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ফলাফল ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।