বরিশালে ৪৬ বছর পর বিএনপির ঐতিহাসিক বিজয়, জামায়াত-ইসলামী আন্দোলনের ভোট বিভাজনে সুবিধা
বরিশালে ৪৬ বছর পর বিএনপির ঐতিহাসিক বিজয়

বরিশাল বিভাগে বিএনপির ৪৬ বছর পর ঐতিহাসিক বিজয়

বরিশাল বিভাগে প্রায় ৪৬ বছর পর ভূমিধস বিজয় পেয়েছে বিএনপি। বিভাগের ২১টি আসনের মধ্যে এবার বিএনপি ও জোটের প্রার্থীরা ১৮টিতে জয় পেয়েছেন। এর আগে ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপি বরিশাল বিভাগে ১৮টি আসনে জয়ী হয়েছিল। বরিশালের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এতগুলো আসনে জয় বিএনপির প্রতি ভোটারদের আস্থার স্পষ্ট প্রতিফলন। এটি শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং গণতন্ত্রের পথে মানুষের নতুন করে প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

নির্বাচনী ইতিহাসে বিএনপির উত্থান-পতন

নির্বাচনী ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ২১টির মধ্যে সর্বোচ্চ ১৮টি আসনে জয় পায়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মাত্র দুটি ও মুসলিম লীগ একটি আসনে জয়ী হয়েছিল। এরপর আর কখনো এই বিভাগে বিএনপি এমন সাফল্য পায়নি। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সাতটি আসন পায়, আওয়ামী লীগ পায় ১১টি এবং জাতীয় পার্টি ১টি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির আসন কমে দাঁড়ায় পাঁচটিতে। সেবার আওয়ামী লীগ ১১টি ও জাতীয় পার্টি ৫টি আসনে জয় পায়। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সারা দেশে বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করে। ওই নির্বাচনে বরিশাল বিভাগে দলটি ১৫টি আসনে জয় পায়। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে আসে মাত্র দুটিতে। দীর্ঘ ৪৬ বছর পর এবারের নির্বাচনে আবারও বিএনপি ১৮টি আসনে জয় পেল।

ইসলামী আন্দোলনের প্রথমবারের সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব

এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এই বিভাগে প্রথমবারের মতো দুটি আসনে জয়ী হয়েছে। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রায় ৩৯ বছর পর প্রথমবার জাতীয় সংসদে একটি আসন পেয়েছে। এর আগে দলটির কোনো সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব ছিল না। প্রচারণায় এগিয়ে থেকেও ইসলামী আন্দোলনের পরাজয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় সক্রিয় থাকলেও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। দলটি বিভাগের সব আসনে প্রার্থী দিলেও একজন ছাড়া সবাই পরাজিত হন। এমনকি দলটির আমির চরমোনাই পীর সৈয়দ রেজাউল করীমের তিন ভাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কেউ বিজয়ী হতে পারেননি।

ভোটের ফলাফল ও বিশ্লেষণ

ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ ফয়জুল করীম বরিশাল-৫ আসনে দ্বিতীয় হলেও বরিশাল-৬ আসনে তৃতীয় হয়েছেন। বরিশাল-৫ আসনে তিনি ৯৩ হাজার ৫২৮ ভোট পেয়েছেন। সেখানে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৩১ হাজার ৪৩১ ভোট। বরিশাল-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন খান ৮১ হাজার ৮৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. মাহমুদুন্নবী পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৫৩৩ ভোট। আর ফয়জুল করীম পেয়েছেন ২৮ হাজার ৮২৩ ভোট। বরিশাল-৪ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ছিলেন আরেক ভাই সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের। তিনি ৩৬ হাজার ৭৫৩ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। একই আসনে বিএনপির প্রার্থী রাজীব আহসান ১ লাখ ২৮ হাজার ৩২২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকা-৪ আসনে তাঁদের আরেক ভাই মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ মাত্র ৬ হাজার ৫১৮ ভোট পেয়েছেন। ফলে তাঁর জামানতও রক্ষা হয়নি। ভোটের ফল ঘোষণার পর ফয়জুল করীম অবশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বরিশাল-৫ আসনে নিজের পাওয়া ভোটের সংখ্যা উল্লেখ করে ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

জামায়াতের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা

জামায়াত এবার দুটি আসনে জয় পেলেও আরও সাতটি আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। পিরোজপুর-১ ও পটুয়াখালী-২ আসনে দলটির প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। এ ছাড়া পিরোজপুর-২, বরগুনা-২, বরিশাল-৪ ও বরিশাল-৬ আসনে দলটি ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। একইভাবে ভোলার চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে জামায়াতের প্রার্থীরা মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। এর আগে এই বিভাগে জামায়াতের এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণার মাঠে সরব থাকলেও ভোটের ফলাফলে তার প্রতিফলন ঘটেনি। এর পেছনে বড় কারণ জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের জোট ভেঙে যাওয়ায় দুই দলের ভোট ভাগ হয়ে গেছে। এর বড় সুবিধা পেয়েছে বিএনপি। আর অনেকটা ক্ষতির মুখে পড়েছে জামায়াত। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বরিশাল মহানগরের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, চরমোনাই দরবারের সামাজিক প্রভাব থাকলেও সেটি এখনো কার্যকর ভোটব্যাংকে রূপ নেয়নি। ফলে দলটি বরিশালে তেমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারেনি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় বিএনপির সঙ্গে সরাসরি বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এসেছে জামায়াত। ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় দুই দলের ভোট ভাগ হয়েছে, যার বড় সুবিধা পেয়েছে বিএনপি। দুই দলের জোট থাকলে বিএনপি যেসব আসনে কম ব্যবধানে জয় পেয়েছে, সেখানে জামায়াত বা ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।