চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ব্যাপক অভিযান শুরু
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী যৌথ বাহিনীর ব্যাপক অভিযান শুরু হয়েছে। আজ সোমবার সকাল ছয়টা থেকে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবের সদস্যরা এই অভিযানে অংশগ্রহণ করছেন। প্রায় ৪ হাজার সদস্য এই অভিযানে জড়িত রয়েছেন বলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার (গণমাধ্যম) মো. রাসেল নিশ্চিত করেছেন।
অভিযানের পটভূমি ও প্রস্তুতি
গত জানুয়ারি মাসে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালাতে গিয়ে র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন। এই ঘটনার পর থেকেই এলাকাটি আলোচনায় আসে এবং সমন্বিত অভিযান চালানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে থাকায় তখন অভিযান স্থগিত রাখা হয়েছিল।
আজ সকালে জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্বারা। প্রবেশ ও বাহিরের পথগুলোতে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে, যাতে অভিযান শুরুর পর কেউ পালিয়ে যেতে না পারে। বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে কৌশলগতভাবে অভিযানে অংশ নিচ্ছেন, কারণ অতীতে অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ার ঘটনা রয়েছে।
জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান ও চ্যালেঞ্জ
জঙ্গল সলিমপুর চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর জায়গায় অবস্থিত। সীতাকুণ্ড উপজেলায় হলেও নগরের কাছেই এই এলাকা, যার পূর্ব দিকে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ বোস্তামী থানা রয়েছে।
এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকা দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের 'নিরাপদ আস্তানা' হিসেবে পরিচিত। চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে এখানে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। এখনো পাহাড় কেটে প্লট-বাণিজ্য চলছে, এবং এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে। এলাকাটিতে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে এসব সন্ত্রাসী, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক প্রভাব
জঙ্গল সলিমপুরে দুটি প্রধান সন্ত্রাসীপক্ষ সক্রিয় রয়েছে বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন, যিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীতাকুণ্ডের সংসদ সদস্য এস এম আল মামুনের অনুসারী ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ইয়াসিন নিজেকে বিএনপি নেতা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আসলাম চৌধুরীর অনুসারী দাবি করে আসছেন।
অপর পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন রোকন উদ্দিন। র্যাব কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে আসলাম চৌধুরী দাবি করেছেন যে জঙ্গল সলিমপুরে তাঁর কোনো অনুসারী নেই এবং ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত নন।
অতীতের সহিংস ঘটনা
গত বছরের অক্টোবরে জঙ্গল সলিমপুরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হন। পরদিন সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলা ও মারধরের শিকার হন দুই সাংবাদিক। এই ঘটনাগুলো এলাকার অপরাধপ্রবণতা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাত্রা তুলে ধরে।
র্যাবের ওপর হামলার মামলায় ইয়াসিন, নুরুল হক ভান্ডারীসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ২০০ জনকে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, র্যাব সদস্যরা আসামি ধরতে গেলে তাঁদের ওপর সন্ত্রাসী মোহাম্মদ ইয়াসিনের নির্দেশে রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল।
এই যৌথ অভিযানের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এলাকার সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমনে জোরালো পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে আশা করা হচ্ছে। অভিযানের বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।



