প্রাণী নির্যাতন বন্ধে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবীর আইনি নোটিশ, ২১ দফা সুপারিশ
দেশজুড়ে প্রাণীর ওপর নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় চলমান নিষ্ঠুরতা বন্ধে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খন্দকার হাসান শাহরিয়ার। রোববার (১২ এপ্রিল) এই নোটিশটি পাঠানো হয়, যা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
নোটিশ প্রাপকদের তালিকা
এই আইনি নোটিশটি পাঠানো হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের কাছে। নোটিশে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি গুরুতর প্রাণী নির্যাতনের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
বাগেরহাটের কুকুর-কুমির ঘটনা
নোটিশে বাগেরহাটে খান জাহান আলীর মাজার এলাকায় একটি জীবিত কুকুরকে কুমিরের সামনে ছুঁড়ে দেওয়ার ঘটনাকে গুরুতর আইন লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তা দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে। এছাড়াও, রাজধানীর ধানমন্ডিতে বিড়াল হত্যা, কাটাবনে পশু-পাখির মৃত্যু এবং বিভিন্ন স্থানে কুকুর-বিড়ালের ওপর নির্যাতনের অন্যান্য ঘটনাগুলোও নোটিশে তুলে ধরা হয়েছে।
২১ দফা সুপারিশ
আইনজীবী খন্দকার হাসান শাহরিয়ারের পাঠানো নোটিশে প্রাণীর সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে ২১টি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার জরুরি আহ্বান জানানো হয়েছে। এই সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো:
- প্রাণী কল্যাণ আইন-২০১৯ সংশোধন: বর্তমান আইনটি সংশোধন করে শাস্তির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো।
- প্রাণী খাদ্যের ওপর ভ্যাট ও ট্যাক্স প্রত্যাহার: প্রাণী খাদ্যের ওপর থেকে সকল প্রকার ভ্যাট ও ট্যাক্স প্রত্যাহার করা, যাতে প্রাণী পালন সহজ ও সাশ্রয়ী হয়।
- জাতীয় প্রাণী কল্যাণ কর্তৃপক্ষ গঠন: একটি স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করা, যা প্রাণী কল্যাণ নীতিমালা তদারকি করবে।
- বিশেষ টাস্কফোর্স ও প্রাণী পুলিশ সেল: প্রাণী নির্যাতন বন্ধে বিশেষ টাস্কফোর্স এবং ‘প্রাণী পুলিশ সেল’ গঠন করা, যারা দ্রুত ঘটনা তদন্ত ও ব্যবস্থা নেবে।
- প্রাণীদের জন্য কবরস্থান ও এনিমেল হোটেল: প্রতিটি এলাকায় প্রাণীদের জন্য নির্দিষ্ট কবরস্থান ও সরকারি এনিমেল হোটেল স্থাপন করা।
- সরকারি পশু হাসপাতালে উন্নত সেবা: সরকারি পশু হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা চালু করা এবং বিনামূল্যে জলাতঙ্ক টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
- ৯৯৯-এর মাধ্যমে রেসকিউ সেবা: ৯৯৯-এর মাধ্যমে প্রাণীদের জন্য ২৪/৭ রেসকিউ সেবা চালু করা, যাতে জরুরি অবস্থায় দ্রুত সহায়তা পাওয়া যায়।
- পাঠ্যবইয়ে প্রাণী কল্যাণ শিক্ষা: স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ে প্রাণী কল্যাণ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে নতুন প্রজন্ম সচেতন হয়।
সরকারের প্রতি চূড়ান্ত সময়সীমা
নোটিশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বাগেরহাটের কুকুর-কুমির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তিন দিনের মধ্যে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া, অন্যান্য সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ না নিলে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হবে। আইনজীবী খন্দকার হাসান শাহরিয়ার জানিয়েছেন, তিনি আশা করছেন যে সরকার দ্রুত ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে এবং প্রাণী নির্যাতন রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
এই নোটিশটি প্রাণী অধিকার ও কল্যাণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং জনসচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করবে।



