এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক চিত্র: প্রথম ত্রৈমাসিকে ৩৬ জন নিহত রাজনৈতিক সহিংসতায়
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সারা দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৩৬ জন নাগরিক নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি, মব বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ আক্রমণ এবং গণপিটুনির ঘটনায় ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা ও রাজনৈতিক মামলার পরিসংখ্যান
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৩৯৫টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে ১২ জন নিহত এবং ২ হাজার ৫৭৩ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচনী সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৮ জন, জামায়াতের ২ জন, আওয়ামী লীগের ১ জন এবং একজনের রাজনৈতিক পরিচয় অজ্ঞাত রয়েছে।
রাজনৈতিক মামলা ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ, বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৭৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১ হাজার ৮৫০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং ২১ হাজার ৭৪ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহতা
প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হিসেবে উঠে এসেছে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যান। গত তিন মাসে ৬৭০ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ১৪৭ জন, যৌন নিপীড়নের শিকার ১৮০ জন এবং পারিবারিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৩৬ জন নারী।
এছাড়া ৩২৮ জন কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো মানবাধিকার পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির ইঙ্গিত বহন করছে।
সীমান্ত সহিংসতা ও কারাগারে মৃত্যু
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ১৩টি হামলার ঘটনায় একজন নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ১১টি সহিংসতার ঘটনায় ১ জন নিহত ও ৫ জন আহত হন।
কারা হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ৩৯ জন আসামি মারা গেছেন। ৩৯ জনের মধ্যে ১৬ জন কয়েদি ও ২৩ জন হাজতি। এর মধ্যে ১২ জন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী।
সাংবাদিক নির্যাতন ও মতপ্রকাশে বাধা
এইচআরএসএস জানিয়েছে, এ সময়ে ৮২টি হামলার ঘটনায় ১৭৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১২২ জন আহত, ২০ জন লাঞ্ছিত এবং ২১ জন হুমকির মুখে পড়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৭টি সভা-সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধার ঘটনায় ২০৪ জন আহত হয়েছেন।
সংস্থার নির্বাহী পরিচালকের বক্তব্য
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, 'মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।' তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, 'রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সংস্কৃতি এবং মতপ্রকাশে বাধা অব্যাহত থাকলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিতে পড়বে।'
সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, তাদের নিজস্ব তথ্য এবং ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকের এই মানবাধিকার পরিস্থিতির চিত্র তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।



